কীভাবে ঘটনার শুরু?
স্পেন কাঁপানো জাপাতেরো কেলেঙ্কারি: সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ‘অদৃশ্য ক্ষমতা ও দুর্নীতির সাম্রাজ্য’
একসময় তাকে বলা হতো আধুনিক স্পেনের উদারপন্থী রাজনীতির মুখ। ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান, সমকামী বিবাহ বৈধ করা, সামাজিক সংস্কার—এসব কারণে হোসে লুইস রদ্রিগেস জাপাতেরো শুধু স্পেনেই নয়, পুরো ইউরোপে পরিচিত ছিলেন একজন প্রগতিশীল নেতা হিসেবে। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই মানুষটিকেই ঘিরে তৈরি হয়েছে স্পেনের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ফোরক রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি।
আজ স্পেনের আদালত, দুর্নীতি দমন ইউনিট, সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে একটি প্রশ্ন—ক্ষমতা ছাড়ার পরও কি জাপাতেরো গোপনে বিশাল এক রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন?
তদন্তকারীদের ভাষায়, এটি শুধু দুর্নীতির মামলা নয়; এটি ছিল “অদৃশ্য ক্ষমতার কাঠামো”, যেখানে রাজনীতি, ব্যবসা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যবহার করে কোটি কোটি ইউরোর আর্থিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হতো।
এই কেলেঙ্কারির সূত্রপাত অবশ্য হঠাৎ হয়নি। এর শেকড় তৈরি হয়েছিল কয়েক বছর আগে, করোনা মহামারির ভয়াবহ সময় থেকে।
২০২০ সাল। পুরো ইউরোপ তখন অর্থনৈতিক সংকটে। করোনাভাইরাসে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, বিমান চলাচল স্থবির, হাজার হাজার কোম্পানি দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে। সেই পরিস্থিতিতে স্পেন সরকার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে একটি বিশেষ উদ্ধার তহবিল গঠন করে।
ঠিক তখনই সামনে আসে ‘প্লাস উল্ট্রা’ নামের একটি ছোট বিমান সংস্থা।
স্পেনের সাধারণ মানুষ তখনও এই কোম্পানির নাম খুব বেশি জানত না। তাদের বিমান ছিল হাতে গোনা কয়েকটি, যাত্রী সংখ্যাও সীমিত। বড় কোনো আন্তর্জাতিক অবস্থানও ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই সরকার এই প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৫৩ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা দেয়।
প্রথম প্রশ্নটা তখনই ওঠে—কেন?
দেশটির বড় বড় বিমান সংস্থাগুলো যখন আর্থিক সংকটে ধুঁকছিল, তখন তুলনামূলক ছোট একটি কোম্পানিকে এত বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ কেন দেওয়া হলো? বিরোধী দলগুলো অভিযোগ তোলে, এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে।
প্রথমদিকে সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে। বলা হয়, প্লাস উল্ট্রা “কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ” একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কয়েকজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসতে থাকে অস্বাভাবিক কিছু তথ্য।
দেখা যায়, প্লাস উল্ট্রার মালিকানা ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার কিছু গোষ্ঠীর সম্পর্ক রয়েছে। আরও দেখা যায়, কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা এতটাই দুর্বল ছিল যে, সাধারণ নিয়মে তারা এমন সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ছিল না।
এখান থেকেই তদন্তের আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।
স্পেনের অর্থনৈতিক অপরাধ তদন্ত ইউনিট UDEF বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করে। প্রথমে এটি ছিল কেবল আর্থিক অনিয়মের অনুসন্ধান। কিন্তু ব্যাংক হিসাব, ফোন রেকর্ড, ই-মেইল এবং ব্যবসায়িক নথি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তদন্তকারীরা এমন একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান পান, যা ধীরে ধীরে স্পেনের রাজনৈতিক অন্দরমহলকে নাড়িয়ে দেয়।
তদন্তকারীদের দাবি, এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাপাতেরো।
তখন তিনি আর সরকারি পদে ছিলেন না। কিন্তু তদন্তে উঠে আসে, তিনি এখনও স্পেনের রাজনীতি, ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। বিভিন্ন ব্যবসায়ী, লবিস্ট, বিদেশি প্রতিনিধি এবং করপোরেট ব্যক্তিদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
পুলিশি প্রতিবেদনে তাকে বলা হয় “লিডার এন লা সোমব্রা”—অর্থাৎ “ছায়ার আড়ালের নেতা”।
তদন্তকারীরা সন্দেহ করতে শুরু করেন, জাপাতেরো সরাসরি সরকারি সিদ্ধান্ত না নিলেও তার প্রভাব ব্যবহার করে ব্যবসায়িক সুবিধা আদায় করা হতো। আর সেই সুবিধা নিশ্চিত করতে গড়ে তোলা হয়েছিল একাধিক কোম্পানি ও আর্থিক কাঠামো।
এই জায়গাতেই সামনে আসে তথাকথিত “ইন্সট্রুমেন্টাল কোম্পানি” বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি।
তদন্তে দাবি করা হয়, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হতো অর্থ লেনদেন আড়াল করতে। কাগজে-কলমে দেখানো হতো পরামর্শক সেবা, গবেষণা, ব্যবসায়িক বিশ্লেষণ বা কনসালটেন্সি। কিন্তু বাস্তবে সেসব কাজের অনেকগুলোর অস্তিত্বই ছিল না।
তদন্তকারীদের ভাষায়, এগুলো ছিল “অর্থ প্রবাহকে বৈধ দেখানোর জন্য তৈরি কৃত্রিম কাঠামো”।
সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটে যখন তদন্তে জাপাতেরোর দুই মেয়ে—লরা ও আলবা রদ্রিগেস এসপিনোসার নাম উঠে আসে।
তাদের প্রতিষ্ঠান ‘হোয়াটদ্যফ্যাভ’কে তদন্তকারীরা সন্দেহ করছেন একটি “ফাইনাল চ্যানেল” হিসেবে, যেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থ এসে জমা হতো, পরে সেখান থেকে অন্যত্র পাঠানো হতো।
পুলিশের দাবি, কোম্পানিটি ভুয়া কনসালটেন্সি রিপোর্ট তৈরি করত। এসব রিপোর্টের মাধ্যমে কোটি ইউরোর লেনদেনকে বৈধ ব্যবসায়িক সেবা হিসেবে দেখানো হতো।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—জাপাতেরো নিজেই মেয়েদের ব্যাংক হিসাব পরিচালনার অনুমোদিত ব্যক্তি ছিলেন।
অর্থাৎ, তদন্তকারীদের মতে, তিনি পুরো আর্থিক প্রবাহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
এরপর তদন্ত আরও দ্রুত এগোতে থাকে।
স্পেনের বিভিন্ন শহরে অভিযান চালানো হয়। জাপাতেরোর ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও সহযোগীদের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয় নগদ অর্থ, গোপন নথি, কম্পিউটার হার্ডডিস্ক এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য।
এক অভিযানে প্রায় তিন লাখ ইউরো নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়, যা গলফ ব্যাগ, ভ্রমণের ব্যাগ এবং ঘরের গোপন স্থানে লুকানো ছিল।
জাপাতেরোর অফিস থেকেও উদ্ধার করা হয় নথিপত্র ও একটি সেফ। সেই সেফে থাকা গয়না ও দামি ঘড়ির মূল্য কয়েক হাজার ইউরো বলে জানিয়েছে তদন্তকারীরা।
তবে জাপাতেরো সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি কোনো অবৈধ কাজ করেননি। তিনি বলছেন, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত এবং তাকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা হচ্ছে।
কিন্তু তদন্তকারীরা বলছেন, তারা এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য পেয়েছেন, তা কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; বরং সংগঠিত আর্থিক অপরাধের ইঙ্গিত বহন করে।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। তদন্তে উঠে এসেছে ভেনেজুয়েলা ও চীনের কিছু ব্যবসায়িক যোগাযোগের তথ্য। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগও স্পেনকে কিছু তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বলে জানা গেছে।
এই কারণেই এখন পুরো স্পেনে আলোচনা—এটি কি শুধুই দুর্নীতির মামলা, নাকি ইউরোপীয় রাজনীতির আড়ালে থাকা প্রভাবশালী ক্ষমতার এক ভয়ংকর চিত্র?
বর্তমানে তদন্ত চলছে। আদালত, প্রসিকিউটর, দুর্নীতি দমন ইউনিট—সবাই এখন এই মামলার পরবর্তী ধাপের দিকে তাকিয়ে। স্পেনের মানুষও অপেক্ষা করছে—এই তদন্ত শেষ পর্যন্ত সত্যিই কি একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর গোপন সাম্রাজ্যের মুখোশ খুলে দেবে, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক সংঘাতের আরেকটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।













