বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতায় ভারতের অস্বস্তি, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতির নতুন সমীকরণ
ঢাকা ও দিল্লি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে—যা ভারতের কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
কয়েক মাস আগে ওমানের মাস্কাটে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সের ফাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের মধ্যে বৈঠক হয়। আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্থবির হয়ে থাকা সার্ককে (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব আসে। তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এখন সার্ক নিয়ে আলোচনা উপযুক্ত সময় নয়। এমনকি তিনি সতর্ক করে বলেন, সার্ককে জাগিয়ে তোলার দাবি করা মানে পাকিস্তানের সুরে সুর মেলানো বলেই গণ্য করবে ভারত।
পাকিস্তান-বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠতা: নতুন বাস্তবতা
এদিকে গত কয়েক মাসে ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতি—প্রায় সব ক্ষেত্রেই যোগাযোগ বেড়েছে। বহু বছর পর বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি করেছে, দুই দেশের মধ্যে পুনরায় সরাসরি বাণিজ্য শুরু হয়েছে। ভিসা নীতি সহজ করা ও সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তান বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা জানিয়েছে। সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পারস্পরিক সফরও বাড়ছে।
সর্বশেষ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার ঢাকা সফরে এসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসসহ শীর্ষ উপদেষ্টা, এমনকি বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সফরকালে তিনি একাত্তরের ইস্যুতে ‘মীমাংসিত’ মন্তব্য করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
ভারতের কৌশলগত শঙ্কা
ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের এই উষ্ণতা ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ভারতীয় সেনাপ্রধান অনিল চৌহান সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন—চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ক স্বার্থের একধরনের মিল দেখা যাচ্ছে, যা ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা যেখানে বিগত এক দশকেরও বেশি সময় শান্ত ছিল, এখন সেখানে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
কূটনৈতিক মহলে শঙ্কা রয়েছে যে, বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়লে চীনের সঙ্গে সমন্বয় ঘটতে পারে, যা ভারতের নিরাপত্তা নীতি জটিল করবে। ভারতের সাবেক কূটনীতিকরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন—২০০০-এর দশকে বাংলাদেশের মাটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা ছিল, যা পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে দমন করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি পাল্টালে সেই ঝুঁকি ফিরতে পারে।
পর্দার আড়ালের ভূরাজনীতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে আন্তর্জাতিক প্রভাবও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে নতুন কৌশল প্রয়োগ করছে—যেখানে ভারতকে একক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে না দেখে পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে সমান্তরালে তুলে ধরা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় শুরু হওয়া এই ধারা বর্তমানেও প্রভাব বিস্তার করছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
আইডিওলজিক্যাল প্রতিযোগিতা
ভারতীয় বিশ্লেষকরা আরেকটি দিক নিয়ে সতর্ক করছেন—পাকিস্তান বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের বৃত্তি দিয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে রবীন্দ্রনাথ-প্রভাবিত ধারা দুর্বল হয়ে পাকিস্তানি আদর্শের প্রভাব বাড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
উপসংহার
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। তবে পাকিস্তান যদি সেই বয়ানকে হালকা করার প্রচেষ্টা চালায় এবং বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে তা ভারতের কৌশলগত স্বার্থে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় গঠিত এই নতুন সমীকরণ শুধু ভূরাজনৈতিক নয়, বরং নিরাপত্তা ও চিন্তাধারার দিক থেকেও প্রভাব ফেলতে পারে।













