ইরান ইস্যুতে ইউরোপের নীরব কৌশল, চাপে আছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল?
ছবিটি এআই দিয়ে করা।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা সরাসরি বিরোধিতায় না গেলেও, বিভিন্ন কৌশলগত ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত দূরত্ব বজায় রাখছে—যা অনেক বিশ্লেষকের মতে ‘নরম পুশব্যাক’।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যেমন রয়টার্স, বিবিসি’র প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো এই সংঘাতে সরাসরি জড়াতে অনাগ্রহী। তাদের প্রধান উদ্বেগ হচ্ছে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তা জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশেষ করে ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে নিঃশর্ত সমর্থন না দিয়ে শর্তসাপেক্ষ সহযোগিতার পথে হাঁটছে। কিছু ক্ষেত্রে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে অনুমতির বিষয়টি কঠোর করা, কিংবা কূটনৈতিকভাবে আপত্তি তোলা—এসব পদক্ষেপ স্পষ্ট বার্তা দেয় যে ইউরোপ যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে চায় না। যদিও তারা ন্যাটো জোটের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য, তবুও নিজেদের জাতীয় স্বার্থে সীমারেখা টানার চেষ্টা করছে।
এই অবস্থানের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা সরাসরি তেলের বাজারকে প্রভাবিত করে, যার প্রভাব পড়ে ইউরোপের শিল্প ও ভোক্তা পর্যায়ে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা ইউরোপীয় সরকারগুলোকে আরও সতর্ক করে তুলেছে। ফলে তারা এমন কোনো অবস্থান নিতে চায় না, যা সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
একই সঙ্গে ইউরোপ কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বারবার সব পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার কথা বলছে। তাদের এই অবস্থান ইঙ্গিত করে যে, সামরিক সমাধানের বদলে আলোচনার মাধ্যমেই স্থায়ী সমাধান সম্ভব বলে তারা বিশ্বাস করে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও যুদ্ধ নিয়ে চাপ বাড়ছে। জনমত দ্রুত যুদ্ধ সমাপ্তির পক্ষে ঝুঁকছে, যা ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপের কূটনৈতিক চাপ এবং সীমিত সহযোগিতা মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একটি পরোক্ষ প্রভাব তৈরি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা। ইউরোপ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র, অন্যদিকে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় তারা সরাসরি সামরিক জড়িততা এড়িয়ে চলছে। ফলে তারা প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করেও, বাস্তবে যুদ্ধের গতি কমানোর দিকে একটি ‘নরম কিন্তু কার্যকর’ চাপ সৃষ্টি করছে।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ইউরোপ আরও দৃঢ়ভাবে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে। আর সেটি হলে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের গতিপথে ইউরোপ একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।













