ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৬.০৩ শতাংশে, যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে সর্বনিম্ন। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা একে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে দেখছেন।
পতনের পরিসংখ্যান: জুলাই থেকে জানুয়ারির চিত্র
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—
- জুলাই ২০২৪: ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.১৩%
- আগস্ট ২০২৪: রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হার দ্রুত কমতে শুরু
- সেপ্টেম্বর–ডিসেম্বর ২০২৫: যথাক্রমে ৬.২৯%, ৬.৩৫%, ৬.৫৮% ও ৬.১%
- জানুয়ারি ২০২৬: সর্বনিম্ন ৬.০৩%
বিশ্লেষকদের মতে, নভেম্বর মাসের সাময়িক ঊর্ধ্বগতি প্রকৃত বিনিয়োগের ফল ছিল না; বরং নির্বাচনের আগে বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিলের কারণে কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেশি দেখায়।
কেন বিনিয়োগে ভাটা?
১. নীতি সুদহার ও ঋণের উচ্চ ব্যয়
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এর প্রভাবে বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
২. অবকাঠামো ও জ্বালানি সংকট
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীরা ঋণ নেওয়ার আগে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও বন্দরের সুবিধা বিবেচনা করেন। বর্তমান সংকটে বিদ্যমান ব্যবসায়ীরাও সম্প্রসারণে অনাগ্রহী।
৩. সরকারের বাড়তি ব্যাংক ঋণ
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকার নিট ৫০ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। সীমিত তারল্যের বড় অংশ সরকার নিয়ে নেওয়ায় বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের জোগান সংকুচিত হয়েছে।
৪. খেলাপি ঋণের চাপ
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা—মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব
- মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হ্রাস: ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের গতি কমছে
- উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সংকট: অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করছে
- ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া: বাজারে অর্থের সঞ্চালন হ্রাস পাওয়ায় ক্রয়ক্ষমতা নিম্নমুখী
নতুন গভর্নরের আশ্বাস
এই প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নিয়েছেন নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বিনিয়োগ বাড়ানো ও বন্ধ শিল্প-কারখানা পুনরায় চালুর জন্য নীতিগত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক হয়তো দীর্ঘদিনের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি শিথিল করার কথা বিবেচনা করছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সুদহার কমালেই সমাধান হবে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনর্গঠন এখন সবচেয়ে জরুরি।
বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে নেমে আসা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্থরতার ইঙ্গিত বহন করছে। দ্রুত এই হার ৯ শতাংশের ওপরে ফেরানো না গেলে শিল্প উৎপাদন আরও দুর্বল হতে পারে এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধ তাই দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।










