সিলেটের ওসমানীনগরে চোরাই গরু দিয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসীর ইফতার
ছবিঃ সংগৃহীত
সিলেটের ওসমানীনগরে চোরাই গরু জবাই করে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিএনপি কার্যক্রমে জড়িত এক ব্যক্তির বাড়িতে আয়োজিত ইফতার মাহফিলকে ঘিরে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে পরে গরুর প্রকৃত মালিককে মূল্য পরিশোধ করে ঘটনাটি ‘মীমাংসা’র চেষ্টা করা হয়।
জানা যায়, ওসমানীনগর উপজেলার পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের গলমুকাপন গ্রামে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এম আহমদ ওরফে মধু মিয়ার বাড়িতে চলতি রমজানের ৬তম দিনে সহস্রাধিক মানুষের অংশগ্রহণে এক ইফতার ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এম আহমদ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন এবং সেখানে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। জানুয়ারিতে সিলেট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনার নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে তিনি দেশে আসেন এবং নির্বাচন শেষে নিজ গ্রামে ইফতার মাহফিল করার সিদ্ধান্ত নেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রবাসে থাকা অবস্থায়ই এম আহমদ তাঁর বাড়ির তত্ত্বাবধায়কের কাছে আগাম গরু কেনার টাকা পাঠিয়ে দেন, যাতে রমজানে বড় আকারে ইফতার আয়োজন করা যায়। তবে অভিযোগ, ওই তত্ত্বাবধায়ক নির্ধারিত টাকায় গরু না কিনে হয় তা অন্য কাজে খরচ করেন, নয়তো গরু কিনে বিক্রি করে দেন। পরে ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি মাঠে চরতে থাকা প্রতিবেশী নাজমুল ইসলামের একটি গরু রেখে আসার নাম করে চুপিসারে ধরে এনে রাতে জবাই করেন।
পরদিন ইফতার মাহফিলে প্রায় সহস্রাধিক মানুষ উপস্থিত হন; তাঁদের মধ্যে চুরি হওয়া গরুর মালিক নাজমুল ইসলামও ছিলেন। ইফতারের পরই গ্রামে একটি গরু হারানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে এবং বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। একপর্যায়ে সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে প্রবাসীর বাড়ির দিকে; বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সাইদ গোপনে গরুটি বাড়িতে এনে জবাই করেছেন।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর গ্রামে স্থানীয় ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সালিস বসে। সেখানে প্রবাসীর বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক সাইদ গরু চুরির কথা স্বীকার করেন এবং জানান, ইফতার আয়োজনের চাপ সামলাতে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গরুর মালিক নাজমুল ইসলাম সালিসে বলেন, প্রবাসী এম আহমদের সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত অভিযোগ নেই; বরং তিনি তত্ত্বাবধায়কের কাজকর্মে ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত। পরে প্রবাসী এম আহমদ গরুর ন্যায্য মূল্য মালিককে পরিশোধ করেন এবং তত্ত্বাবধায়ককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন।
এম আহমদ ঘটনার পরদিনই লজ্জা ও বিব্রতবোধ নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি; তবে তিনি ঘনিষ্ঠ মহলে বিষয়টি ‘নিজের অজান্তে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের বিব্রতকর ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে স্থানীয়রা জানান।
গ্রামবাসী রেজওয়ান আহমদ বলেন, প্রবাসী এম আহমদ প্রায় ১৭ বছর পর এলাকায় ফিরে এসে ইফতার মাহফিলের মাধ্যমে সবাইকে একত্র করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়কের অবিবেচনাপ্রসূত কাজ পুরো ঘটনাকে অপ্রীতিকরভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। একই গ্রামের হোসেন আহমদও জানান, প্রবাসী আগে থেকেই বলেছিলেন, তিনি গরু কিনে রেখেছেন; পরে জানা যায়, বাস্তবে সেই গরু কেনাই হয়নি, বরং অন্যের গরু চুরি করে জবাই করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘চোরাই গরু দিয়ে ইফতার মাহফিল’ শিরোনামে বিভিন্ন পোস্ট, ভিডিও এবং প্রতিবেদন ভাইরাল হলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম নেয়। অনেকেই এটিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে আড়াল করে অপরাধমূলক কাজের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন, আবার কেউ কেউ প্রবাসীর সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তত্ত্বাবধায়কের কারণে তাঁর সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করছেন।
ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুরশেদুল আলম ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনাটি নিয়ে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।










