জাপান-বাংলাদেশ ইপিএ চুক্তিতে রপ্তানির সুযোগ
জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাংলাদেশের বাণিজ্য কূটনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। সংস্থাটির মতে, এই চুক্তি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিজিএমইএ জানিয়েছে, টোকিওতে শুক্রবার স্বাক্ষরিত জাপান-বাংলাদেশ ইপিএ বাংলাদেশের প্রথম অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি, যা দেশটির বাণিজ্য ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অর্জন। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও।
পণ্য ও সেবা বাণিজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে সাত দফা আলোচনার মাধ্যমে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে। বিজিএমইএ মনে করে, এটি পারস্পরিক স্বার্থে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা গভীর করার ক্ষেত্রে দুই দেশের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
সংস্থাটি আরও জানায়, জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার এবং সর্ববৃহৎ অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিসট্যান্স (ওডিএ) প্রদানকারী দেশ। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরে জাপানের অবদান উল্লেখযোগ্য। সে কারণে এই ইপিএ কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়, বরং দীর্ঘদিনের আস্থাভিত্তিক অংশীদারিত্বের স্বাভাবিক অগ্রগতি।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাজারে স্থিতিশীল ও পূর্বানুমেয় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। সেই বাস্তবতায় জাপান-বাংলাদেশ ইপিএ একটি সময়োপযোগী ও কৌশলগত উদ্যোগ।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে মনে করছে বিজিএমইএ। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে ১ হাজার ৪১১ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যেখানে জাপানের মোট বৈশ্বিক পোশাক আমদানি প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
একক বাজার হিসেবে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারক হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ দেশটিতে যায়। বিজিএমইএ মনে করে, ইপিএ কার্যকর হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের অংশ অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব।
প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইপিএর আওতায় তৈরি পোশাক খাত নিরবচ্ছিন্ন শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং অনুকূল ‘রুলস অব অরিজিন’ সুবিধা পাবে। বর্তমানে জিএসপি স্কিমের আওতায় বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও এলডিসি উত্তরণের পর ইপিএ কার্যকর না থাকলে নিটওয়্যারে ৮ থেকে ১৫ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি শুল্ক গুনতে হতো। নতুন চুক্তির ফলে কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই সব ধরনের পোশাক পণ্যে শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে।
এছাড়া চুক্তির ৩ নম্বর অধ্যায় ও ২ নম্বর অ্যানেক্স অনুযায়ী, এক স্তরবিশিষ্ট প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত পোশাকও জাপানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, যা বর্তমান জিএসপি ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিজিএমইএ মনে করে, ইপিএ একটি অনুকূল ও পূর্বানুমেয় বাণিজ্য পরিবেশ তৈরি করায় এর সম্ভাবনাকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ভিশনের সঙ্গে সংযুক্ত করে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন জরুরি।
বর্তমানে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৪৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। বিজিএমইএর বিশ্বাস, ইপিএ এই ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে এবং পোশাকের বাইরেও রপ্তানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করবে। পাশাপাশি জাপানি আমদানিকারক, খুচরা বিক্রেতা, যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা বাড়বে।
সংস্থাটি আরও মনে করে, জাপানের সঙ্গে এই ইপিএ এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতিতে একটি দিকনির্দেশক ভূমিকা পালন করবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস–সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর)-এর সঙ্গে চলমান আলোচনায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে বিজিএমইএ, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারের মাধ্যমে শূন্য শুল্ক সুবিধা অর্জনের প্রস্তুতি নেওয়া যায়।












