স্পেনের সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রস্তাব ঘিরে বিতর্ক চরমে: নজরদারিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হবার আশঙ্কা করছেন পাভেল দুরভ
সোশ্যাল মাধ্যম নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সঙ্গে ‘এক্স’ ও টেলিগ্রামের মালিকদের সংঘাত চরমে পৌঁছেছে। টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী পাভেল দুরভ বুধবার স্পেনের সব টেলিগ্রাম ব্যবহারকারীর কাছে পাঠানো এক গণবার্তায় সানচেজ সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা হরণ অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, এসব উদ্যোগ “সুরক্ষার অজুহাতে স্পেনকে নজরদারিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে”।
এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “টেকনো-অলিগার্করা চেঁচামেচি করুক, সানচো—এটাই প্রমাণ করে আমরা ঠিক পথেই এগোচ্ছি।” তিনি বিশ্বখ্যাত সাহিত্যকর্ম ‘দন কিহোতে’-এর একটি উক্তির ইঙ্গিত দেন।
এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ হলো শিশু ও কিশোরদের সোশ্যাল মাধ্যম ব্যবহার সীমিত করার সরকারি প্রস্তাব। সানচেজ সরকার ষোল বছরের নিচে শিশু-কিশোরদের জন্য সোশ্যাল মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, অ্যালগরিদমে কারসাজির অভিযোগে প্ল্যাটফর্ম মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিশেষ করে ঘৃণামূলক ও অবৈধ বিষয়বস্তুর জন্য মালিকদের ফৌজদারি দায়িত্ব নির্ধারণের ঘোষণা দিয়েছে।
এর আগের দিন ‘এক্স’-এর মালিক ও বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ক সানচেজকে “ফ্যাসিস্ট” বলে কটূক্তি করেন। এবার একই সুরে, তবে তুলনামূলকভাবে সংযত ভাষায়, পাভেল দুরভ অভিযোগ করেন যে স্পেন সরকার “ডিজিটাল স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলছে”। তিনি টেলিগ্রাম ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকার, স্বচ্ছতা দাবি করার এবং নিজেদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, স্পেন সরকারের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় লা মনক্লোয়ার মতে, এসব আক্রমণই প্রমাণ করে যে সরকার একটি বাস্তব সমস্যার দিকে আঙুল তুলেছে। তাদের ভাষায়, কিছু প্রযুক্তি ধনকুবেরের হাতে জনমত ও তথ্যপ্রবাহের ওপর প্রায় সীমাহীন ক্ষমতা জমা হয়েছে, যা বিশেষ করে তরুণদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকারের এক সদস্য বলেন, “আমরা প্রকৃত ক্ষমতাবানদের অস্বস্তিতে ফেলছি—এটাই ভালো লক্ষণ।”
লা মনক্লোয়া দুরভের বক্তব্য খণ্ডন করে একটি নথি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়, ব্যবহারকারীদের অনুমতি ছাড়াই টেলিগ্রামের পক্ষ থেকে গণবার্তা পাঠানোই প্রমাণ করে কেন সোশ্যাল মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। সরকারের মতে, “বিদেশি টেকনো-অলিগার্করা ইচ্ছেমতো আমাদের ফোনে প্রচারণা ঢুকিয়ে দিতে পারে—এমন পরিস্থিতি মেনে নেওয়া যায় না, বিশেষ করে যখন সরকার শিশুদের সুরক্ষার কথা বলছে।”
সরকার আরও দাবি করেছে, পাভেল দুরভ বিভিন্ন দেশে গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে তদন্তাধীন। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে টেলিগ্রাম শিশু যৌন নির্যাতন, মাদক পাচারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করা হয়। দুরভের পাঠানো বার্তাকে সরকার “ভিত্তিহীন তথ্যভিত্তিক প্রচারণা” বলে আখ্যা দিয়েছে।
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে বলেন, সোশ্যাল মাধ্যমের মালিকদের কনটেন্টের জন্য দায়ী করার ধারণা অত্যন্ত শক্তিশালী। তাঁর মতে, একবার আইনি দায়বদ্ধতা কার্যকর হলে ঘৃণা ও বিশৃঙ্খলায় ভরা বর্তমান সোশ্যাল মাধ্যম পরিবেশ আর টিকবে না।
সানচেজ ও তাঁর দল দীর্ঘদিন ধরেই এই অবস্থান নিয়ে কাজ করছে। অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশও একই ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। সরকারের দাবি, সোশ্যাল মাধ্যমের অ্যালগরিদম ঘৃণামূলক বক্তব্যকে উৎসাহিত করছে, যা গণতান্ত্রিক বিতর্ককে বিষাক্ত করে তুলছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই হাজার পঁচিশ সালে স্পেনে সোশ্যাল মাধ্যমে প্রায় নয় লাখ ঘৃণামূলক বিষয়বস্তু শনাক্ত হয়েছে। দেশের প্রতি পাঁচজন কিশোরের একজন অনলাইন সহিংসতা বা সাইবার হয়রানির শিকার হয়েছে বা তা প্রত্যক্ষ করেছে। দুই হাজার তেইশ থেকে দুই হাজার চব্বিশ সালের মধ্যে শিশু সহায়তা নম্বরে ফোন বেড়েছে একচল্লিশ শতাংশ।
অন্যদিকে, দুরভ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষকে আইনি দায়িত্বে ফেললে অতিরিক্ত সেন্সরশিপ শুরু হবে এবং ভিন্নমত, সাংবাদিকতা ও সাধারণ মতামত চাপা পড়বে। তবে স্পেন সরকার মনে করে, নিয়ন্ত্রণের অভাবই বর্তমানে জনপরিসরকে আরও অসহিষ্ণু ও কম গণতান্ত্রিক করে তুলছে।
সব মিলিয়ে, শিশু সুরক্ষা ও ডিজিটাল স্বাধীনতার প্রশ্নে স্পেন সরকার ও বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের এই সংঘাত ইউরোপজুড়ে সোশ্যাল মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।









