গ্রিনল্যান্ড ইস্যু
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির বিরুদ্ধে ইউরোপের কঠোর অবস্থান, তীব্র হচ্ছে সম্পর্কের টানাপোড়েন
ছবিটি এআই দিয়ে করা।
গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনার বিরোধিতা করায় আটটি ইউরোপীয় মিত্র দেশের ওপর নতুন করে শুল্কারোপের যে হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছেন, তা নিয়ে ইউরোপজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইউরোপের শীর্ষ নেতারা এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মিত্রতার জন্য বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং একে চাপ প্রয়োগের অগ্রহণযোগ্য কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, নেটোভুক্ত মিত্র দেশগুলোর ওপর শুল্কারোপ করা সম্পূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত। তার মতে, যৌথ নিরাপত্তার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি, সেখানে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সুরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ এই পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, ইউরোপ কোনো ধরনের হুমকি বা ভীতির কাছে নতি স্বীকার করবে না।
ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এই শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে, যা জুন মাস থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রির বিষয়ে কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক বহাল থাকবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’। তিনি এমনকি প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। তার ভাষায়, ওয়াশিংটন চাইলে ‘সহজ’ অথবা ‘কঠিন’ উপায়েই গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
এই বক্তব্য ও শুল্ক হুমকির প্রতিবাদে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে। তুলনামূলকভাবে কম জনসংখ্যা হলেও গ্রিনল্যান্ড প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এবং ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে এটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক নজরদারির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
শুল্ক আরোপের হুমকির পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ডেনমার্কের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছে। তারা বলছে, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নেটোর যৌথ দায়িত্ব এবং একক কোনো দেশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এই জোটের মূল চেতনার পরিপন্থী। এরই মধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য সীমিত পরিসরে সৈন্য পাঠিয়েছে, যা তারা ‘নজরদারি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন দৃঢ় অবস্থানে থাকবে। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উল্ফ ক্রিস্টারসন বলেন, ইউরোপ কোনোভাবেই ব্ল্যাকমেইলের শিকার হবে না এবং এ বিষয়ে সমন্বিত প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা করে বলেছেন, তারা একটি ‘বিপজ্জনক খেলা’ খেলছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপকে শুল্ক ছাড় দিয়ে কার্যত ভর্তুকি দিয়ে এসেছে এবং এখন ডেনমার্কের সেই ঋণ শোধ করার সময় এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে এই বিরোধ কেবল একটি ভূখণ্ডগত প্রশ্ন নয়; এটি ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক, নেটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুল্ক যুদ্ধ শুরু হলে তা বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।










