গণআন্দোলনের চাপেও অটল ইরানের খামেনি শাসন
ইরানে অর্থনৈতিক ধস, মুদ্রাস্ফীতি, রিয়ালের পতন আর ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে রেকর্ডসংখ্যক বিক্ষোভ সত্ত্বেও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি–নেতৃত্বাধীন শাসন এখনো টিকে আছে। চলমান বিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়ালেও তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেনি যেখানে সামরিক বাহিনী বিভক্ত হবে বা ক্ষমতার ভেতর থেকে বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হবে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও জ্বালানির দাম এবং রিয়ালের ব্যাপক পতনের প্রতিবাদে তেহরানসহ ইরানের সব প্রদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পর্যবেক্ষক এই আন্দোলনকে ১৯৭৯–এর পর দেশের সবচেয়ে বড় গণআন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করছেন।
বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ, গ্রেপ্তার ও গণহারে দমন-পীড়নে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে এবং ইন্টারনেট বন্ধ রেখে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্য হচ্ছে আন্দোলনের গতি ভেঙে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও ক্লান্তি তৈরি করা।
খামেনি সরকারের পাশে রয়েছে বিপ্লবী গার্ড (আই আর জি সি ) ও বাসিজ মিলিশিয়াসহ বহুস্তর নিরাপত্তা কাঠামো, যারা দ্রুত ও নির্মমভাবে বিক্ষোভ দমন করছে। রাষ্ট্র নিয়মিত গুলি, গণগ্রেপ্তার, দ্রুত মৃত্যুদণ্ড, শহরভিত্তিক সামরিক মোতায়েন ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ব্যবহার করছে।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভে নারী, তরুণ, শ্রমিক, ট্রাকচালক, বাজারের ব্যবসায়ী ও জাতিগত সংখ্যালঘুসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ জড়িত থাকলেও কোনো একক নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি। পরিষ্কার রাজনৈতিক রোডম্যাপ বা বিকল্প ক্ষমতা কাঠামোর অভাবে আন্দোলনের শক্তি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
অনেকের মূল দাবি অর্থনৈতিক সমাধান, আবার অনেকেই পুরো শাসনব্যবস্থা বদলাতে চান, ফলে দাবিগুলো একটি সুসংহত রাজনৈতিক লক্ষ্য তৈরি করতে পারছে না। এই বৈচিত্র্যময় ও কখনও পরস্পরবিরোধী এজেন্ডা শাসনের ওপর চাপকে খানিকটা লঘু করে দিচ্ছে।
ইরানের অর্থনীতি ও কৌশলগত খাতের বড় অংশ বিপ্লবী গার্ড ও খামেনিপন্থী সামরিক–ধর্মীয় অভিজাতদের হাতে, যাদের জন্য এই ব্যবস্থার টিকে থাকা সরাসরি অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন। ‘রেজিস্ট্যান্স ইকোনমি’ ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা বৈদেশিক মুদ্রা ও বড় প্রকল্প থেকে বিপুল লাভ করছে।
সেনাবাহিনী,আই আর জি সি , পুলিশ বা বাসিজের অভ্যন্তরে এখনো বড় কোনো গণ–বিদ্রোহ বা বিভক্তির স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতরেও প্রকাশ্য ফাটল দেখা না যাওয়ায় শাসনব্যবস্থা আপাতভাবে সংহত রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে শাসন পরিবর্তনের জন্য দরকার সংগঠিত নেতৃত্ব, বৃহত্তর ধর্মীয়–রাজনৈতিক এলিটের ভাঙন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অংশবিশেষের প্রকাশ্য অবস্থান পরিবর্তন। বর্তমান আন্দোলন এখনো সেই সব উপাদান তৈরি করতে পারেনি, কিন্তু ধারাবাহিক বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক ধস ভবিষ্যতে আরও বড় ও সুসংগঠিত গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে যেতে পারে।










