ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ
নিহত ৫০০ ছাড়িয়েছে: হাসপাতালে ‘লাশের স্তুপ’, হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকেরা
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সংঘর্ষ ও সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের টানা সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক ছাড়িয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করছে। আহত ও নিহত মানুষের চাপে বহু হাসপাতাল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে অনেক ক্ষেত্রে আহতদের বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময় বা সুযোগ পাচ্ছেন না তারা। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারি এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাতের সতর্কবার্তায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। দেশটির নেতৃত্ব স্পষ্ট করে জানিয়েছে, কোনো হামলা হলে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন ‘ভুল হিসাব-নিকাশ’ না করে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সাবেক এই কমান্ডারের ভাষায়, ইরানে হামলা মানেই পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি।

এদিকে দেশের ভেতরে বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ইরানি সরকার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৫৩৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই বিক্ষোভকারী, যদিও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। তবে রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলো এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহতদের কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।

বিক্ষোভের বাস্তব চিত্র আড়াল করতে বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, টানা ৬০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইরান কার্যত ডিজিটাল অন্ধকারে রয়েছে। ফলে দেশটির ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিবিসির সঙ্গে গোপনে কথা বলা তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সংঘর্ষে আহত ও নিহত মানুষের চাপ সামাল দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। অধিকাংশ আহতের শরীরে সরাসরি গুলির ক্ষত রয়েছে বলে জানান তারা। একজন চিকিৎসক বলেন, বহু তরুণের মাথা ও বুকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। অনেকেই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন।
তেহরানের একটি বড় হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়েছেন, মরদেহ রাখার মতো জায়গা না থাকায় একটির ওপর আরেকটি লাশ স্তূপ করে রাখতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাসপাতালের প্রার্থনা কক্ষেও মরদেহ রাখা হয়েছে। রাশত শহরের একটি হাসপাতালে এক রাতে ৭০টির বেশি মরদেহ আনার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে অনেক আহতকে কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন দেওয়ার সময়ও পাচ্ছেন না চিকিৎসকেরা।
বিক্ষোভে আহতদের বড় একটি অংশের চোখে ও শরীরের ওপরের অংশে গুলি লাগার কথা জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। শর্টগানের গুলিতে অনেকের চোখ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। জরুরি সেবার চাপ সামাল দিতে বহু হাসপাতালে সাধারণ অস্ত্রোপচার ও ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। ছুটিতে থাকা চিকিৎসক ও নার্সদেরও ডেকে পাঠানো হয়েছে।
এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল মূলত অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তা রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন দেশটির শতাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনব্যবস্থার অবসান দাবি করছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একদিকে জনগণের প্রতিবাদকে অধিকার হিসেবে স্বীকার করলেও অন্যদিকে ‘দাঙ্গাবাজদের’ বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, সরকার জনগণের কথা শুনতে প্রস্তুত, তবে সমাজকে অস্থিতিশীল করার কোনো চেষ্টা বরদাশত করা হবে না। তিনি চলমান অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে অভিযোগ করেন, বিদেশ থেকে প্রশিক্ষিত লোকজন এনে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, ইরান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি করে স্বাধীনতা চাইছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। এই মন্তব্যকে ইরান সরাসরি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
ইসরায়েলও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলে দেশটির নিরাপত্তা সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে। সাম্প্রতিক নিরাপত্তা বৈঠকগুলোতে সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গত জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এখনো টাটকা থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলও ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা সহিংস দমন-পীড়নের নিন্দা জানিয়েছে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। তবে ইন্টারনেট বন্ধ এবং বিদেশি গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকায় প্রকৃত চিত্র কতটা ভয়াবহ, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান একদিকে অভ্যন্তরীণ গণঅসন্তোষ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ ও সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। সংকট কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্বজুড়ে।













