অচেনা লাশে ভরে গেছে গাজার হাসপাতাল, ডিএনএ পরীক্ষার সুযোগও নেই
গাজায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফেরত পাওয়া ৯০ জন ফিলিস্তিনির মৃতদেহ শনাক্তে কাজ করছে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি। হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাসপাতাল বিভাগের মহাপরিচালক ডা. মোহাম্মদ জাকুত জানিয়েছেন, যদি মৃতদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, তাহলে ছবিগুলো অনলাইনে প্রকাশ করা হবে, যাতে স্বজনরা তাদের প্রিয়জনকে শনাক্ত করতে পারেন। ফেরত পাওয়া মরদেহগুলো বর্তমানে খান ইউনুসের নাসের হাসপাতালে সংরক্ষিত আছে। তবে এগুলো গাজায় নিহত ফিলিস্তিনিদের নাকি ইসরায়েলি হেফাজতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের দেহ, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
বিবিসির এক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, নাসের হাসপাতালের মর্গে একটি চোখ বাঁধা মৃতদেহ এবং আরেকটি হাত-পায়ের কব্জিতে দাগযুক্ত দেহ রাখা আছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও বিচার মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এর আগে ইসরায়েল বন্দিদের প্রতি অমানবিক আচরণ বা নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গত সপ্তাহে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইসরায়েল প্রতিশ্রুতি দেয়, প্রতিটি মৃত ইসরায়েলি জিম্মির বিনিময়ে ১৫ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ ফেরত দেবে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ছয়জন ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ এবং একজন নেপালি নাগরিকের দেহাবশেষ ফেরত এসেছে। এ ছাড়া হামাস সোমবার জীবিত শেষ ২০ জন জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে, বিনিময়ে ইসরায়েল ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দি ও গাজার ১,৭১৮ জন আটক ব্যক্তিকে মুক্তি দেয়।
ইসরায়েল সোমবার ৪৫ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের (ICRC) কাছে হস্তান্তর করে এবং বুধবার আরও ৪৫ জনের দেহ হস্তান্তর করে। রেড ক্রসের মাধ্যমে দেহগুলো নাসের হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। মঙ্গলবার হাসপাতালের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ডা. জাকুত বলেন, প্রথম দফায় ফেরত পাওয়া দেহগুলো ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করেছিল। কিছু দেহ সহজেই শনাক্ত করা যাচ্ছে, আবার কিছু চেনা কঠিন। তিনি বলেন, যখন নিশ্চিত হওয়া যাবে, তখন আমরা নামগুলো প্রকাশ করব, যাতে পরিবারের সদস্যরা এসে প্রিয়জনদের দাফন করতে পারেন। তবে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের কাছ থেকে মৃতদের নাম বা মৃত্যুর কারণ সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। “আমরা কোড ও নম্বরসহ দেহ পেয়েছি,” বলেন তিনি, “প্রতিশ্রুতি ছিল নামগুলোও দেওয়া হবে, কিন্তু এখনো পাইনি। যদি না পাই, তাহলে আমরা এমন একটি অনলাইন লিংক তৈরি করব, যেখানে শনাক্তযোগ্য শহিদদের ছবি প্রকাশ করা হবে।”
গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গত দুই বছরের যুদ্ধে প্রায় ভেঙে পড়েছে। ডিএনএ পরীক্ষা বা আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে মৃতদেহ শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নাসের হাসপাতালের বাইরে দেখা যায় রাসমিয়া কুদেইহকে, খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলীয় খুজা শহরের বাসিন্দা। তিনি তার ৩৬ বছর বয়সী ছেলে ফাদিকে খুঁজছিলেন, যিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ। সেদিন হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই ঘটনায় ১,২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জন জিম্মি হন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এরপর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৬৭,৯৩৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন—যা জাতিসংঘও নির্ভরযোগ্য হিসেবে স্বীকার করেছে।
রাসমিয়া বলেন, “আমি জানি না আমার ছেলে বন্দি না শহিদ। আমি সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, কেউ কিছু বলতে পারেনি। প্রতিবার কোনো বন্দি মুক্তি পেলে আমি জিজ্ঞেস করি—তুমি কি ফাদিকে দেখেছ? কেউ না বলে। আমি শুধু জানতে চাই, আমার ছেলে তাদের মধ্যে আছে কি না। যদি না থাকে, আমি ভেঙে পড়ব। আমার ছেলেকে চিনে ফেলব—তার এক পা কাটা, শরীরে ভিটিলিগো আছে, চুল সাদা। আমি তাকে চিনব।”
ঠিক কতজন ফিলিস্তিনির মৃতদেহ ইসরায়েল ধরে রেখেছে তা নিশ্চিত নয়। তবে ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠন “ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর দ্য রিকভারি অব মার্টির্স’ বডিজ” জানিয়েছে, ইসরায়েল বর্তমানে ৭৩৫ জনের মরদেহ, যার মধ্যে ৯৯ জন গাজার, নিজেদের মর্গ বা কবরস্থানে সংরক্ষণ করে রেখেছে। সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, গত বছরের ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল সদে তেইমান সামরিক ঘাঁটিতে প্রায় ১,৫০০ হামাস যোদ্ধার দেহাবশেষ সংরক্ষণ করছে।










