উপদেষ্টাদের সেফ এক্সিটের প্রয়োজন নেই, আইন উপদেষ্টা,আসিফ নজরুল
অন্তবর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন,বর্তমানে ‘সেফ এক্সিট’ নিয়ে নানা রকম আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু উপদেষ্টারা ভালোভাবেই জানেন যে, তাদের কোন প্রকার ‘সেফ এক্সিটের প্রয়োজন নেই।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের বলরুমে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এর খসড়া বিষয়ক জাতীয় আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
আইন উপদেষ্টা বলেন,আপনারা জানেন এখন ‘সেফ এক্সিট’ নিয়ে নানা কথাবার্তা হচ্ছে। আমরা উপদেষ্টারা খুব নিশ্চিতভাবে জানি আমাদের কারো কোনো ‘সেফ এক্সিট’ এর প্রয়োজন নেই। বরং জাতি হিসেবে দেশের মানুষের বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সৃষ্ট বিধ্বংসী রাষ্ট্র কাঠামো থেকে সেফ এক্সিটের প্রয়োজন আছে।
তিনি বলেন,গত ৫৫ বছর আমরা যে দুঃশাসন, গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দেখলাম, আরও দেখলাম ব্যাংক থেকে সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা লুট হচ্ছে। এ ধরনের একটি ভয়াবহ ও আত্মবিধ্বংসী রাষ্ট্র কাঠামো থেকে আমাদের এ জাতির সেফ এক্সিট এর প্রয়োজন আছে।
তিনি বলেন, বাহাত্তরের সংবিধানে বলা হয়েছিলো যে রাষ্ট্রপতি বিচারপতিকে স্বাধীনভাবে নিয়োগ করবেন যেন এতে রাজনৈতিক প্রভাব না থাকে। কিন্তু সবাই জানেন রাষ্ট্রপতি কখনই স্বাধীনভাবে বিচারপতিকে নিয়োগ করতে পারেননি। এদেশে সবসময় বিচারপতি নিয়োগ পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী। আইন উপদেষ্টা বলেন,’আমরা এমন প্রধান বিচারপতিও পেয়েছি যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র ধ্বংস করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যারা নিজের চোখে গুম,বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দেখেও তা উপেক্ষা করেছেন। যে সকল বিচারক মানবাধিকার লংঘনে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে তাদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তিনি বলেন,দুঃখজনকভাবে এমন কেউ কেউ এখনো বিচার বিভাগে রয়ে গেছে। আমরা ইনস্টিটিউশনাল রিফর্ম এর পথে কিছুটা অগ্রসর হয়েছি,পুরোটা করতে পারি নাই।
পরে যারা নির্বাচিত সরকার হবেন,তাদের কাছে এই দায়িত্বটা থাকলো।
আইন উপদেষ্টা বলেন,আমরা হয়তো ভালো ভালো কিছু আইন করে যাচ্ছি। কিন্তু ভালো আইন করা মানেই পুরো দেশটা বদলে যাবে সেরকম নয়। দেখা গেছে অনেক ভালো ভালো আইন করা হলেও সে আইন যে প্রতিষ্ঠানের জন্য করা হয়েছে সে প্রতিষ্ঠানই দাঁড়ায় না। আইন করার ক্ষেত্রে আমাদের কোন ব্যর্থতার ইতিহাস নেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠান করার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা সীমাহীন।’
ভালো প্রতিষ্ঠান গড়া একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া উল্লেখ করে আইন উপদেষ্টা বলেন,আশা করব এই আইনটি দ্বারা সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারবো।
ভয়াবহ এ রাষ্ট্র কাঠামো থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার প্রয়োজন আছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে উচ্চ আদালত ও সংসদীয় কমিটি। এবং সেই সঙ্গে আরও কিছু জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানকে আমাদের শক্তভাবে দাঁড় করাতে হবে,যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মানবাধিকার কমিশন। এটি করতে ব্যর্থ হলে দেশের যে কোনো মানুষ যে কোনো সময় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হতে পারেন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা সম্পর্কে আইন উপদেষ্টা বলেন,এটি সরকার বা কোনো একক ব্যক্তির নয় বরং আমাদের সকলের দায়িত্ব।
সংশোধিত আইনটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্বাধীনতাকে আরো শক্তিশালী করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ছাড়াও আরও বক্তব্য রাখেন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, এটর্নী জেনারেল মো.আসাদুজ্জামান,আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী, বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেতো সিগফ্রেড রেংগলি,ড্যানিশ দূতাবাসের ডেপুটি হেড অফ মিশন এন্ডার্স বি. কার্লসেন, ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (ইউএনডিপি) রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ স্টেফান লিলারসহ আরও অনেকে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের আইন,বিচার এবং নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা রোমানা শোয়েগার।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আইন মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা,দেশ বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত শিক্ষক ও শিক্ষার্থী,বিভিন্ন মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন ও সংস্থার প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।










