ফিলিস্তিনের পক্ষে ইউরোপ জুড়ে তৈরি হচ্ছে ব্যাপক জনমত: চাপ বাড়ছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে
ফিলিস্তিনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করে। এই ছবিটি স্পেনের বার্সেলোনার।
গাজা যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপে এক গভীর পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বড় বড় শহরে ব্যাপক ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ, ইসরায়েলকে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি এবং গাজায় ত্রাণ পৌঁছাতে ইউরোপীয় নৌবাহিনী মোতায়েন—সবই এই পরিবর্তনের প্রতিফলন। কয়েকটি দেশ এমনকি অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতিও দিয়েছে।
মানবিক বিপর্যয়ের তীব্রতা বাড়তে থাকায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতারা ক্রমেই সরব হচ্ছেন। জনগণের চাপের মুখে তারা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের প্রতি যুদ্ধবিরতি ও ত্রাণ প্রবাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, “ইউরোপে গত এক বছরে জনমতের চাপ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমালোচনায় সাহসী করেছে।”
ইতালির অবস্থান বদল:
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, যিনি একসময় ইইউ’র ভেতরে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন, তিনিও মনোভাব পাল্টেছেন। পালার্মো থেকে মিলান পর্যন্ত বিক্ষোভ এবং ধর্মঘটের পর তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা সমর্থনের ঘোষণা দেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণে মেলোনি বলেন, “ইসরায়েল মানবিক নিয়ম ভঙ্গ করে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।”
যুদ্ধের ভয়াবহতা:
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস নেতৃত্বাধীন যোদ্ধাদের হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫০ জনের বেশি জিম্মি হন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে গাজায় এখন পর্যন্ত ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানায় গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ধ্বংস হয়েছে বিশাল এলাকা, নিহত হয়েছেন ২৮৯ সাংবাদিক, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ এবং গাজা সিটিতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে।
ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভ:
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্ট (ACLED)-এর তথ্যানুযায়ী, ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইউরোপে ৭৮০টি ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ হলেও গত পাঁচ মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,০৬৬—প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১৫টি। বিপরীতে এ সময় প্রো-ইসরায়েল সমাবেশ হয়েছে মাত্র ৫১টি।
রাজনৈতিক চাপে ইউরোপীয় নেতারা:
ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন প্রথমদিকে ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানালেও এখন তিনি নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ইইউ কর্মী ও সাবেক কূটনীতিকদের হাজারো স্বাক্ষরিত খোলা চিঠি এবং ক্রমবর্ধমান জনমতের চাপও তার অবস্থান বদলে দিয়েছে। তিনি ইসরায়েলি পণ্যে শুল্ক বাড়ানো, বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং হামাস নেতাদের শাস্তির প্রস্তাব করেছেন।
জার্মানি বনাম ইতালি:
জার্মানি ঐতিহাসিক কারণে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান সমর্থক হলেও বর্তমান সরকারে বিভাজন দেখা দিয়েছে। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং অস্ত্র বিক্রি সীমিত করেছেন, তবে নিষেধাজ্ঞার কথা ভাবছেন না। অন্যদিকে ইতালি, ভ্যাটিকান ও শ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাবের কারণে, ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানকে সমর্থন দিতে পারে।
সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া অঙ্গনে চাপ:
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোভিশন সং কনটেস্টসহ জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক আসরে ইসরায়েলের অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে কিছু দেশ।
সব মিলিয়ে ইউরোপে ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মনোভাব নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। নেতানিয়াহুর সরকারের জন্য এটি কূটনৈতিক চাপে রূপ নিচ্ছে, আর ইউরোপীয় জনমত ক্রমেই ফিলিস্তিনের পক্ষে একত্রিত হচ্ছে।









