শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন

অনলাইন ডেস্ক প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:১৪ পিএম
এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। বৃহস্পতিবার (০৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এ তথ্য জানান।

সামান্তা তাঁর পোস্টে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট, জাতীয় সংস্কার, নির্বাচন, নারীর অধিকার, বাংলাদেশের কূটনীতি এবং এনসিপির পুনর্গঠন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, যে আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে এনসিপি গঠিত হয়েছিল, বর্তমানে দলটি সেই অবস্থান থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনে এগিয়ে যাচ্ছে।

পোস্টে বিভিন্ন বিষয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি দলটির নেতৃত্বের প্রতি একাধিক প্রশ্নও তুলে ধরেছেন তিনি। সামান্তার দাবি, এখনো পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন ধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতি শুরু করতে পারলেই বাংলাদেশকে নতুন এক সম্ভাবনার জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

পাঠকদের সুবিধার জন্য তাঁর পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো—

কিছুক্ষণ আগে জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে আমি পদত্যাগ করেছি।

আপনারা জানেন আজ থেকে প্রায় এক বছর আগে আমি জাতীয় নাগরিক পার্টির জোট গঠনের প্রশ্নে একটা আলাদা অবস্থান নিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম জামায়াত ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত কোন ক্ষেত্রেই মিত্র হওয়ার যোগ্য না এবং তাদের সাথে জোট করার জন্য এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে।

গত ১১ মাস যাবত আমার রাজনৈতিক বোঝাপড়া অনুযায়ী এনসিপির অতীত কর্মকান্ড বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে যখনই সুযোগ পেয়েছি তখনই দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব প্রদান এবং তর্ক- বিতর্ক বা আলাপ- আলোচনা করেছি। যেহেতু সংগঠনে নানান চড়াই উৎরাই থাকে, সেখানে দল যদি ভুল পথে যায় সেই পথ থেকে দলকে রক্ষা করার চেষ্টা করা আমার রাজনৈতিক কর্তব্য ছিল। সেই কর্তব্য পালন করতে এনসিপির অভ্যন্তরে মতাদর্শিক সংগ্রামকেই বেছে নিয়েছিলাম। কারণ দলের গৃহীত নীতিসমূহকে স্বীকৃত ফোরামগুলোতে যুক্তিসঙ্গত উপায়ে চ্যালেঞ্জ করা ব্যতীত দলকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনার ভিন্ন কোন গণতান্ত্রিক পন্থা ছিলনা। আজ প্রায় এক বছরের এই সংগ্রামের ইতি ঘোষণা করলাম কারণ এনসিপির পক্ষে তার দলের প্রারম্ভের মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক হওয়া সম্ভব বলে মনে করি না।

পদত্যাগ করার জন্য আমি হয়তো আরো উপযোগী সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারতাম, যখন দলের কোন একটি সিদ্ধান্ত বা কর্মকান্ডের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমার পদত্যাগকে মূল্যায়ন করা সহজ হতো কিন্তু আমি মনে করি এই অপেক্ষা অর্থহীন। এনসিপি কখনো কখনো নানান ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকা নিতেই পারে (এমনকি জামায়াতের সাথে জোট ত্যাগ করার মতো সিদ্ধান্ত) কিন্তু তবুও পুরোনো রাজনৈতিক ধাঁচের বাইরে নিজস্ব পরিচয়, চিন্তা ও কর্মসূচী তৈরি করতে পারবে বলে আমি মনে করি না। দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলতে চাই, পুরোনো ব্যবস্থার রাজনৈতিক দল কখনোই রাষ্ট্রের নতুন ব্যবস্থা আনার জন্য সহায়ক হবে না বরং বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

এখন সময় এসেছে যখন দলের সাথে আমার এতদিন যেসব মতপার্থক্য হয়েছে, আলাপ আলোচনা হয়েছে সেসব বিষয় দলের সকলের এবং দলীয় কাঠামোর বাইরের শুভানুধ্যায়ীদের জানানো দরকার।

প্রথম প্রসঙ্গ: সংস্কারের বন্ধু জামায়াত হতে পারে কিনা

দেশের আপামর মানুষের আকাঙ্ক্ষার দল হিসেবে এনসিপির রাজনীতি ছিল সংস্কার। আমাদের এটা নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে যাওয়ার পথে রাষ্ট্রের বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো যেন বাধা দিতে না পারে। সেজন্য কমপক্ষে তিনটি জায়গায় সংস্কার করার দরকার ছিল।

১. সাংবিধানিক সংস্কার (সংবিধানে স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী ভিত্তি পরিবর্তনের জন্য) ২. আইনের সংস্কার (রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন-কানুনকে গণবিরোধী থেকে জনকল্যাণের দিকে নেওয়ার জন্য) ৩. রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার (পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচলিত কাঠামোর সংস্কার এবং এর মাধ্যমে এই ভূখণ্ডের ঔপনিবেশিক রাজনীতি বদলের জন্য)

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই তিনটির মধ্যে একটিকেও নিজ দলের রাজনীতি ও রাষ্ট্রপ্রকল্পের অংশ মনে করে না এবং জামায়াত প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না। সংগঠনটির দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রপ্রকল্প গণতান্ত্রিক রাষ্টপ্রকল্প নয়। জামায়াতকে যতটুকু সংস্কারের কথা বলতে দেখা যায় ততটুকু বলে ২৪ এর আকাঙ্খাকে কুক্ষিগত করার প্রয়োজন থেকে, ভণিতা হিসেবে।

গণতান্ত্রিক সংস্কারের মূল জায়গা একটি উদার গণতান্ত্রিক সামাজিক মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত। অন্যদিকে জামায়াত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপন্থীই শুধু নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সকল সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিয়ে একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই সংগঠনটির রাজনৈতিক অভিপ্রায়। এজন্যই তার রাজনীতির মূলভিত্তি পরিবর্তন হয়নি। তার প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনে গণহত্যাকেও জায়েজ মনে করে জামায়াত। ৭১’এ জামায়াতের ভূমিকাকে অপরাধ মনে না করা এবং এর জন্য জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়া- এই সাংগঠনিক ও দার্শনিক ভিত্তির উপরই দন্ডায়মান।

এনসিপি যখন জামায়াতকে সংস্কারের পথে বন্ধু মনে করেছে তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, যারা স্বভাবজাত কারণেই উদার, গণতান্ত্রিক, যারা সংস্কারের প্রকৃত শক্তি, তারা সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এনসিপির নিজস্ব ও রাজনৈতিক লাইন স্পষ্ট না থাকায় জামায়াতের মধ্যে এনসিপিকে হারিয়ে যেতে হচ্ছে এবং জামায়াতের জন্য নানান ইস্যুতে প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে।

যেহেতু জনগণের আকাঙ্খা থেকে জন্ম নেয়া দল এনসিপি তাই আমি দলকে বারবার এই সমস্যাগুলো সম্পর্কে সাবধান করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি।

দ্বিতীয় প্রসঙ্গ: নির্বাচন

২০২৬ সালের নির্বাচনটি একটি রাজনৈতিক নির্বাচন হিসেবে অনুষ্ঠিত হওয়ার সকল সম্ভাবনা ছিল। এই ভূখন্ডে এমন রাজনৈতিক নির্বাচন বারবার এসেছে যেমন ৪৬ সালে, ৫৪ সালে, ৭০ সালে এমনকি ৯০ সালেও। এসব নির্বাচন কেবল ক্ষমতাসীন দল পরিবর্তনের নয় বরং একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। ২৬ এর নির্বাচনের পূর্বে এটি যেন একটি রাজনৈতিক নির্বাচন না হয়ে ক্ষমতা বদলের নির্বাচনে পর্যবসিত হয়, সেই লক্ষ্যে নির্বাচনকে অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চরিত্র থেকে সরাতে চেয়েছে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো।

এনসিপির সুযোগ ছিল ঐকমত্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের ব্যর্থতা ইত্যাদির পরেও যারা এই পুরোনো ব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে চায় তাদের সাথে জোট করা অথবা একা হলেও একটা রাজনৈতিক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এই কাজটি করতে পারলে এখনকার ফলাফলের চেয়ে আরো ভালো ফলাফল পেতে পারতো এনসিপি। কারণ রাজনৈতিক নির্বাচনের ফলাফল দলীয় ক্ষমতা দিয়ে হয় না। এটাই ইতিহাসে পূর্ববর্তী সকল রাজনৈতিক নির্বাচনের শিক্ষা। কিন্তু এনসিপি ইতিহাসের এই শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে ‘বড়’ রাজনৈতিক দলের লেজুড় হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি আর অভ্যুত্থানোত্তর নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করেছে।

১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশলে অংশ না নিয়েও বর্তমানে যেই ফলাফল এসেছে তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করা যায় এমন পাঁচটি পদ্ধতির কথা আমি দলের নেতৃত্বকে বলেছিলাম কিন্তু দল সে পথে হাঁটেনি। রাজনৈতিক জয় অপেক্ষা নির্বাচনী জয়কে প্রাধান্য দেয়ার ফলে সংস্কারবিহীন সিস্টেম দিয়ে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি করার গ্রহণযোগ্যতাও হারিয়ে ফেলেছে এনসিপি।

এখানে সংক্ষেপে নিরাপত্তাহীনতা প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, শহীদ ওসমান হাদি ঢাকার একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ আসনে, শক্ত প্রতিদ্বন্দীর বিপক্ষে ন্যূনতম পাঁচশত ভোট পাওয়ার আকাঙ্খা নিয়ে সম্পূর্ণ একা নতুন ধরনের নির্বাচনী ক্যাম্পেইন করেছিলেন। অথচ অগণতান্ত্রিক ও অতি পুরাতন নির্বাচনী কৌশল ‘বড় পার্টির সাথে জোট’ করার কারণ হিসেবে ওনার মৃত্যুর ঘটনাকেই ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুরোপুরি অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তৃতীয় প্রসঙ্গ: অভ্যুত্থানে নারীর মালিকানা এবং অধিকার

আধুনিক রাজনীতির ইতিহাসে নারীরা যেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, সেই আন্দোলন পরাজিত হয়নি। বাংলাদেশের লড়াইয়ের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নারীরা ছিলেন এই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক, সম্মুখসারির যোদ্ধা ও রক্ষাকর্তা।

নারীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ন্যায্য হিস্যা, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান—এসবই ছিল এই অভ্যুত্থানে তাদের অংশগ্রহণের ভিত্তি। গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশ নেননি, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। ব্যারিকেডের সামনে তাদের অবস্থান, সাহস ও সক্রিয়তা অভ্যুত্থানকে সার্বজনীন রূপ দিয়েছে।

কিন্তু বিজয়ের পর থেকেই পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক পক্ষগুলো, দলগুলো নারীদের সেই বিজয়ের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে সক্রিয় হয়েছে। আন্দোলনের সময় যেসব সামাজিক অনুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় নাই, যেসব প্রতিবন্ধকতা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণকে থামাতে পারে নাই, বিজয়ের পর সেগুলোকেই নারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবেই নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য হিস্যার দাবিকে কোণঠাসা করে পুরোনো, নারীবিহীন রাজনৈতিক মাঠ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে।

পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে এসে এনসিপির সামনে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ ছিল। দলটি চাইলে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারত। সে জন্য শুধু নারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট না; সংখ্যা, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এনসিপি সেই পথ বেছে নেয়নি বরং দলটির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে গেছে। এর মধ্য দিয়ে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের অবনমন ঘটেছে।

এনসিপি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে আসার যে সম্ভাবনা গণঅভ্যুত্থান তৈরি করেছিল, তা ধারণ করতে চায়নি। বরং পুরোনো দলগুলোর মতোই নারীদের কোণঠাসা করেছে, তাদের প্রতিবাদকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি এবং পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ নারীরা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ। এনসিপি মনে করেনি নারীদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা মানে শুধু দলের নারী সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা নয়; দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা।

বাংলাদেশের মতো সমাজে নারীদের উত্তরণের জন্য ইতিবাচক বৈষম্য বা পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন দরকার —অর্থাৎ ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের এগিয়ে নিতে বিশেষ সুযোগ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। কারণ, রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো নারীদের দমিয়ে রাখতে সক্রিয়। এই ব্যবধান কাটাতে নারীদের শুধু সমান সুযোগ দিলেই চলে না; প্রয়োজন অধিক প্রতিনিধিত্ব, অধিক ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ। এত কিছুর পরও হয়তো প্রতিষ্ঠিত বৈষম্যের পুরো ব্যবধান দূর করা সম্ভব হতো না।

নারীদের রাজনৈতিকভাবে পেছনে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জামায়াত ও অতি-ডানপন্থী শক্তিগুলোর ভূমিকা রয়েছে। এনসিপিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের রক্ষণশীল অবস্থানের অনুসারী ও সহযোগী হয়েছে। ফলে সমস্যাটি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই; দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার মধ্যেও নারীবিরোধী অবস্থান জায়গা করে নিয়েছে।

আন্দোলনে নারী যে ভূমিকা রাখতে পারেন, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে পুরুষও তা রাখতে পারেন না। পুরুষ যখন অন্য পুরুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে দাঁড়ান, তার প্রভাব এক রকম; কিন্তু নারী যখন পুরুষের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন, তখন সেই ভূমিকা প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতাসম্পর্ক ও সামাজিক প্রত্যাশাকে আরও গভীরভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নারীরা ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে সুরক্ষিত করেছেন। অথচ বিজয়ের পর তাদের মর্যাদা, রাজনৈতিক অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

এই বৈপরীত্য একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: আন্দোলনের সময় মিছিলের সামনে নারীদের এগিয়ে রাখা কি তাদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সক্ষমতার স্বীকৃতি ছিল, নাকি বিপদের মুখে তাদের উপস্থিতিকে নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল ছিল? যদি নারীদের সাহস ও ত্যাগ আন্দোলনের প্রয়োজনে গ্রহণ করা হয়, অথচ বিজয়ের পর তাদের ক্ষমতা ও ন্যায্য হিস্যা অস্বীকার করা হয়, তাহলে তাদের অংশগ্রহণের প্রকৃত স্বীকৃতি কোথায়?

যে অভ্যুত্থান বৈষম্য, নিপীড়ন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তার উত্তরাধিকার বহন করার দাবি করা একটি দল নিজের কাঠামোর ভেতরেই বৈষম্যমূলক ক্ষমতাসম্পর্ক পুনরুৎপাদন করতে পারে না। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশগ্রহণ করেননি; তারা আন্দোলনের চরিত্র নির্মাণ করেছেন। যে রাজনৈতিক শক্তি বিজয়ের জন্য নারীর সাহস ও প্রতিরোধকে প্রয়োজনীয় মনে করে, অথচ বিজয়ের পর তাদের সমান মর্যাদা ও ক্ষমতা দিতে অস্বীকার করে, সে শক্তি প্রকৃত অর্থে বৈষম্যবিরোধী নয়।

চতুর্থ প্রসঙ্গ: কাউন্সিল এড়িয়ে এনসিপির পুনর্গঠন

অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক দলের প্রত্যাশা করেছিল, যার কাঠামো হবে প্রচলিত দলগুলোর চেয়ে ভিন্ন। সেই নতুনত্ব শুধু নেতৃত্ব বা রাজনৈতিক বক্তব্যে বা সাধারণ চলাফেরায় সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং দলের অর্থনৈতিক কাঠামোয় স্বচ্ছতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় গণতন্ত্রের চর্চার মধ্য দিয়েও প্রতিফলিত হবে।

পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোতে আমরা দেখেছি—ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, পরিবারতন্ত্র, পদ-পদবি বণ্টনে স্বজনপ্রীতি, অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব, দলের আর্থিক ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা, ভিন্নমত দমনের প্রবণতা এবং নেতৃত্বের জবাবদিহি না থাকা। ফলে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ কর্মীদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকে, আর নেতৃত্ব পরিবর্তন ও বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে। পুরোনো ধরনের দলগুলোর ক্ষেত্রে কাউন্সিলের সময় পেছানো বা কাউন্সিল করতে না চাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হলো নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন করা। সময়মতো কাউন্সিল না হলে নেতৃত্বের বৈধতা, জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সংশয় তৈরি হয়; সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ক্রমশ সীমিতসংখ্যক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই কাউন্সিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, এটি দলের গণতান্ত্রিক চর্চা ও সাংগঠনিক জবাবদিহির অন্যতম ভিত্তি।

দলের কাউন্সিল না করে পুনরায় আহ্বায়ক কমিটি ‘রিস্ট্রাকচার’ দলের অভ্যন্তরের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যেই প্রবণতা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আছে। বিরোধীমতকে দমন করার পুরোনো প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছে এনসিপি। শুধু তাই নয়, দলের নেতৃত্ব নির্বাচনের আগেই এ ধরনের বড় ধরনের রদবদল এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নেতৃত্বের উদাসীনতাকে স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে এটি জাতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দলটির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনআস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। যে দল নিজের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, তার পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সম্ভব—সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

উপরে বর্ণিত বিষয়সমূহের ব্যাপারে বারংবার পুনর্বিবেচনা করার আহবান জানানোর পরেও এনসিপি তার গতিপথ পরিবর্তন করতে আগ্রহী না হওয়ায় আমি জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে পদত্যাগ করছি। হয়তো আরও ব্যাখ্যা ও কারণ উপস্থাপন করা দরকার কিন্তু এই মূহুর্তে অবকাশ নেই। নিচে আমার রাজনৈতিক অভিমুখ উল্লেখ করছি।

বাংলাদেশের প্রয়োজন বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে ঐক্যের রাজনীতি

বাংলাদেশকে আজ নানা বিভাজনের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল এমন একটি রাজনৈতিক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা তৈরি করা, যা মানুষকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করাবে না; বরং ভিন্নমত, ভিন্ন বিশ্বাস ও ভিন্ন পরিচয় সত্ত্বেও একটি অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষার জায়গায় ঐক্যবদ্ধ করবে। এনসিপি সেই সম্ভাবনা তৈরি করতে পারত। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক শক্তিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা ছিল—প্রচলিত রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে নতুন ধরনের রাজনীতি গড়ে উঠবে। কিন্তু সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসাব ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সেই সম্ভাবনা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটি দলের কিংবা কয়েকজন নেতার সম্ভাবনা হারিয়ে যাওয়া মানে সেই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু নয়, মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া নয়।

আমাদের এখনো এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োজন, যার মূল লক্ষ্য হবে মানুষকে বিভক্ত করা নয়, ঐক্যবদ্ধ করা। এই ঐক্য কোনো বিশেষ মতাদর্শ, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা একক রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয় বরং এর ভিত্তি হতে হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের অভিযাত্রায় অভিন্ন অঙ্গীকার।

এই ঐক্য গড়ে তুলতে হলে যারা নেতৃত্ব দেবেন, তাদের রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ, নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ নয়। ভারতবিরোধিতা করতে গিয়ে আমেরিকার পক্ষ নেওয়া, কিংবা আমেরিকাবিরোধিতা করতে গিয়ে চীনের স্বার্থের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়ে ফেলা—কোনোটিই স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের রাজনীতি হতে পারে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হতে হবে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে; অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বা বিরাগের ভিত্তিতে নয়। ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করলে তার বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার হতে হবে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। এক দেশের ক্ষেত্রে আপসহীনতা আর অন্য দেশের ক্ষেত্রে নীরবতা—এটি বাংলাদেশপন্থা নয়; এটি দ্বৈত মানদণ্ড। প্রকৃত বাংলাদেশপন্থা হলো, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বন্ধু-প্রতিপক্ষ নির্বিশেষে একই নীতি অনুসরণ করা।

একই সঙ্গে এই রাজনৈতিক শক্তিকে নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণকে কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নারীর স্বাধীন অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সমান নাগরিক অধিকারকে রাজনৈতিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

জাতীয় পুঁজির বিকাশ ও সুরক্ষা, দেশীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের প্রসার, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং দেশের সম্পদ ও নীতিনির্ধারণে জনগণের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নেও এই শক্তিকে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা মানে শুধু বিদেশি প্রভাবের বিরোধিতা নয়; দেশের ভেতরেও এমন সব ক্ষমতাকাঠামো ও স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, যা জনগণের অধিকার ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে।

মানুষ তরুণদের পিছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশা নিয়ে, যারা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর পুনরাবৃত্তি করবে না; বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতির পথ তৈরি করবে।

গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নগুলো এখনো নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষায় আছে।

বাংলাদেশের তরুণদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন একটি দল গঠন করা নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য নির্মাণ করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজনই রাজনীতির চালিকাশক্তি হবে না; মতাদর্শের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্যকে তা গ্রাস করবে না; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে কোনো বিদেশি শক্তির অবস্থান থাকবে না। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তরুণ সমাজ যদি আবার সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নেয়, তবে তা হতে হবে অতীতের কোনো দলের পুনরাবৃত্তি নয় বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের নতুন প্রচেষ্টা।

আমি এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, কাজ করতে অংগীকারাবদ্ধ যারা আমার সাথে এবিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে চান সকলকে আহ্বান করছি, যোগাযোগ করুন। আমি আপনাদেরকে সাথে নিয়েই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে চাই।

 

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪ জনের মৃত্যু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৬:২৫ পিএম
হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪ জনের মৃত্যু

সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ জন। শুক্রবার (০৬ নভেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগেই হামের উপসর্গ নিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৭৬ জনে। তাঁদের মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০৫ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ২৩৯ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে দেশে সন্দেহভাজন সংক্রমণের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭১৪ জনে। এ ছাড়া একই সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৫ জন। ফলে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার ২৯৪ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম সন্দেহে ভর্তি হয়েছেন ২ লাখ ১০ হাজার ৯৮২ জন। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ লাখ ২ হাজার ৩৯৪ জন।

প্রায় পাঁচ লাখ বিদেশি কর্মী নেবে ইতালি: বাংলাদেশিদের জন্য বড় সুযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:৪৪ পিএম
প্রায় পাঁচ লাখ বিদেশি কর্মী নেবে ইতালি: বাংলাদেশিদের জন্য বড় সুযোগ

বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন বাংলাদেশি কর্মীরা।

ইতালিতে কাজ করতে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের জন্য নতুন একটি সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। দেশটির অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদ বা আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় অনুমোদিত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা বিদেশি কর্মীরা প্রচলিত বার্ষিক কর্মী নিয়োগ কোটার বাইরে ইতালিতে কাজের জন্য প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন। বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতালীয় ভাষা, দেশটির সমাজ ও আইন সম্পর্কে ধারণা এবং নির্দিষ্ট পেশায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে আগ্রহীদের ইতালির শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একই সময়ে ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরে প্রায় পাঁচ লাখ বিদেশি কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে ইতালি। দেশটির সরকারি কর্মী নিয়োগ পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সময়ে মোট ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০ জন বিদেশি কর্মীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে এই সংখ্যা শুধু বাংলাদেশিদের জন্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত মোট কোটা।

তিন বছরে প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী নেবে ইতালি

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬–২০২৮ মেয়াদে বিদেশি কর্মী প্রবেশের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে- ২০২৬ সালে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫০ জন, ২০২৭ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন, ২০২৮ সালে: ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫০ জন।

এই নিয়োগের আওতায় কৃষি, পর্যটন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, নির্মাণ, পরিবহনসহ বিভিন্ন উৎপাদন ও সেবামূলক খাতের কর্মীদের সুযোগ রয়েছে। নিয়োগের একটি বড় অংশ মৌসুমি এবং অন্য অংশ অমৌসুমি ও স্বনিয়োজিত কাজের জন্য নির্ধারিত।

এই কর্মী নিয়োগ কার্যক্রম ইতালিতে ‘দেক্রেতো ফ্লুসি’ নামে পরিচিত। প্রচলিত ব্যবস্থায় ইতালির নিয়োগকর্তাকে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করতে হয়। আবেদন অনুমোদিত হলে কর্মীর জন্য কাজের অনুমতিপত্র বা ‘নুল্লা ওস্তা’ দেওয়া হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্মী নিজ দেশে ইতালীয় দূতাবাস বা কনস্যুলেটে ভিসার আবেদন করেন।

আর্টিকেল ২৩: প্রচলিত কোটার বাইরে যাওয়ার সুযোগ

ইতালির অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বিদেশে পেশাগত ও নাগরিক-ভাষাগত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা কর্মীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রকল্প সম্পন্নকারীরা প্রচলিত দেক্রেতো ফ্লুসি কোটার বাইরে কাজের উদ্দেশ্যে ইতালিতে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন।

এ ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, ইতালির যেসব খাতে কর্মীর চাহিদা রয়েছে, সেসব খাতের জন্য বিদেশেই দক্ষ কর্মী তৈরি করা। এতে কর্মীরা ইতালিতে যাওয়ার আগেই ভাষা, কাজের দক্ষতা ও দেশটির সামাজিক নিয়মকানুন সম্পর্কে ধারণা পান।

ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, এ ধরনের প্রশিক্ষণ প্রকল্প অবশ্যই অনুমোদিত হতে হবে। প্রকল্পের প্রস্তাব নির্ধারিত সরকারি প্ল্যাটফর্মে জমা দেওয়ার পর আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি তা যাচাই ও মূল্যায়ন করে। শুধু কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রশিক্ষণ সনদ থাকলেই আর্টিকেল ২৩-এর সুবিধা পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশে শুরু হয়েছে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম

ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসের উদ্যোগে ৩ নভেম্বর ‘ল্যাঙ্গুয়েজ, সিভিক অ্যান্ড প্রফেশনাল ট্রেনিং ফর স্কিলড মাইগ্রেশন টু ইতালি’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে ইতালি ও বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

ইতালীয় দূতাবাসের ৪ নভেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় ইতালীয় বেসরকারি খাতের উদ্যোগে প্রথম পর্যায়ের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হয়েছে। অনুষ্ঠানে এ ধরনের প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ও ইতালির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য ও আলোচনা করছেন ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রোসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)।

প্রশিক্ষণ প্রকল্প পরিচালনায় যুক্ত রয়েছে ‘ফ্রন্তিয়েরে স্কিলস’ এবং ‘ফরমাত’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রকল্পের মধ্যে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও আতিথেয়তা খাতের কাজ এবং বস্ত্রশিল্প-সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ রয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের ইতালীয় ভাষা, নাগরিক শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট পেশার দক্ষতা শেখানো হচ্ছে।

ঢাকা ট্রিবিউনের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব প্রশিক্ষণ প্রকল্পে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ফি নেওয়া হবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশিক্ষণের ব্যয় বহন করবে। আগ্রহীদের প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিজ উদ্যোগে আবেদন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আবেদন করা নিষিদ্ধ বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।

প্রশিক্ষণ নিলেই কি ইতালি যাওয়া নিশ্চিত?

না। এ বিষয়টি আগ্রহীদের বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। অনুমোদিত প্রশিক্ষণ শেষ করলেই ইতালির ভিসা বা চাকরি নিশ্চিত হয় না।

প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর ইতালির কোনো নিয়োগকর্তাকে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে চাকরির জন্য নির্বাচন করতে হবে। এরপর নিয়োগকর্তা ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘আলি’ পোর্টালে কর্মীর নামে কাজের অনুমতিপত্র বা ‘নুল্লা ওস্তা’র আবেদন করবেন।

ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট অভিবাসন দপ্তর সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে কাজের অনুমতিপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। তবে নির্দিষ্ট কিছু দেশের আবেদন এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষা বা ব্যতিক্রমী নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে।

নুল্লা ওস্তা পাওয়ার পর কর্মীকে ইতালীয় দূতাবাসে কাজের ভিসার আবেদন করতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে ভিসার আবেদন করার বিধান রয়েছে। ইতালির কূটনৈতিক মিশন সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে ভিসার আবেদন নিষ্পত্তির কথা বলেছে। তবে ভিসা দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দূতাবাসের।

অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষণ, নিয়োগকর্তার চাকরির প্রস্তাব, কাজের অনুমতি এবং ভিসা, প্রতিটি ধাপ আলাদা। কোনো একটি ধাপ সম্পন্ন হলেই পরবর্তী ধাপ নিশ্চিত হয়ে যায় না।

ইতালিতে পৌঁছানোর পর কী করতে হবে?

কাজের ভিসা নিয়ে ইতালিতে প্রবেশের পর কর্মীকে নির্ধারিত নিয়মে বসবাসের অনুমতিপত্র বা ‘পারমেসো দি সোজ্জর্নো’র জন্য আবেদন করতে হবে। ইতালির নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণত প্রবেশের আট দিনের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়। নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে নির্ধারিত চুক্তিও সম্পন্ন করতে হবে।

ইতালিতে কাজের প্রস্তুতি হিসেবে ভাষা প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা।

বসবাসের অনুমতিপত্রের মেয়াদ চাকরির চুক্তি ও সংশ্লিষ্ট নিয়মের ওপর নির্ভর করে। বৈধভাবে দীর্ঘদিন বসবাসের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক অনুমতিপত্রের জন্য আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট সময়ের বৈধ বসবাস, আয়, বাসস্থান ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়।

দালালের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ

ইতালিতে কাজের সুযোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে আয়োজকদের বক্তব্যের বরাতে বলা হয়েছে, কিছু দালাল ইতালির ভিসা ও চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়ার নামে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত দাবি করে। ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশীকে প্রতারিত করা হয়।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ হলো, প্রশিক্ষণ প্রকল্পের অনুমোদন যাচাই না করে কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া যাবে না। কেউ আর্টিকেল ২৩-এর নামে চাকরি বা ভিসা নিশ্চিত করার দাবি করলে সতর্ক হতে হবে। প্রশিক্ষণ প্রকল্পে আবেদন করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি এবং ইতালির দূতাবাস ও বাংলাদেশ সরকারের নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুসরণ করতে হবে।

ইতালীয় দূতাবাসের অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়েছে, আর্টিকেল ২৩-এর প্রশিক্ষণ প্রকল্পের সংখ্যা ও আসন সীমিত। তাই সবাইকে প্রশিক্ষণে নেওয়া বা ইতালিতে পাঠানো সম্ভব হবে না। নির্বাচিত না হলে অপেক্ষা করা বা দেশে থেকেই দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগ্রহীদের এখন কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?

যারা বাংলাদেশ থেকে ইতালি বা ইউরোপের অন্য দেশে কাজ করতে যেতে চান, তাদের জন্য ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন এখন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ইতালির ক্ষেত্রে আগ্রহীরা কয়েকটি বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে, তা হলো- ১. ইতালীয় ভাষার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করা। ২. হোটেল, রেস্তোরাঁ, কৃষি, নির্মাণ বা বস্ত্রশিল্পের মতো কোনো নির্দিষ্ট খাতে বাস্তব দক্ষতা অর্জন করা। ৩. শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ সনদ, পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র প্রস্তুত রাখা। ৪. আর্টিকেল ২৩-এর অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রকল্পের বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করা। ৫. ইতালির দূতাবাস, বাংলাদেশ সরকারের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং সরকারি অভিবাসন-সংক্রান্ত সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা।

ইতালিতে বৈধভাবে কাজ করতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভাষা ও দক্ষতার পাশাপাশি সঠিক তথ্য জানা এবং ধৈর্য ধরে প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি। নতুন এই প্রশিক্ষণ উদ্যোগ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাবনার একটি পথ তৈরি করেছে। তবে সুযোগটি সীমিত এবং প্রতিযোগিতামূলক। তাই কোনো দালালের কথায় বড় অঙ্কের টাকা না দিয়ে সরকারি অনুমোদন ও নিয়োগের প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়াই নিরাপদ।

| তথ্যসূত্র: ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ইতালীয় দূতাবাস ঢাকা, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাদেশ মনিটর।

মুসলিমবান্ধব পর্যটনের বৈশ্বিক গন্তব্য হতে চায় মালয়েশিয়ার পাহাং রাজ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১:২৩ পিএম
মুসলিমবান্ধব পর্যটনের বৈশ্বিক গন্তব্য হতে চায় মালয়েশিয়ার পাহাং রাজ্য

মুসলিমবান্ধব পর্যটনের আন্তর্জাতিক গন্তব্য হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে চায় মালয়েশিয়ার পাহাং রাজ্য। এ লক্ষ্য সামনে রেখে রাজ্যটিতে শুরু হয়েছে পঞ্চম বিশ্ব ইসলামিক পর্যটন সম্মেলন (ডব্লিউআইটিসি) ২০২৬। বিশ্বের ৩৫টির বেশি দেশ থেকে দেড় শতাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি, পর্যটন উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনের অংশগ্রহণে এ সম্মেলন নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং পর্যটন অর্থনীতির বিকাশের পথ তৈরি করছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) পাহাংয়ের কুয়ানতানে জেনিথ হোটেলে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয়। মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টার (আইটিসি) সম্মেলনটির আয়োজন করেছে। এতে আনুষ্ঠানিক সহযোগী ও আয়োজক হিসেবে রয়েছে পাহাং রাজ্য সরকার।

সম্মেলনে পাহাং রাজ্যের কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, জীবপ্রযুক্তি ও শিক্ষা বিষয়ক নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান দাতো শ্রী ইর হাজি মোহাম্মদ সোফি তান শ্রী আবদুল রাজাক বলেন, এ আয়োজন শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাহাংয়ের পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নে পর্যটন খাতের ভূমিকা নিয়ে আলোচনারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
পাহাংয়ে পর্যটনের পাশাপাশি কৃষি, উৎপাদন ও সেবা খাতেও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব খাতের উন্নয়নের সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্থানীয় উদ্যোক্তা, হোমস্টে পরিচালনাকারী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের অংশীদার করতে হবে।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

তিনি বলেন, রাজ্য সরকারের ‘পাহাং ফার্স্ট’ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হচ্ছে রাজ্যের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রতিটি পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়নে এ বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পাহাংয়ের মুখ্যমন্ত্রী দাতো শ্রী দিরাজা হাজি ওয়ান রোজদি ওয়ান ইসমাইলের পক্ষে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ সোফি। এ সময় তিনি মুসলিমবান্ধব পর্যটন খাতের বিকাশে কেন্দ্রীয় সরকার, ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টার, পর্যটনশিল্পের উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেন।

‘সীমান্তের ঊর্ধ্বে বিশ্বাস ও পরিবার’ (ফেইথ অ্যান্ড ফ্যামিলি বিয়ন্ড বর্ডার্স) প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সম্মেলনে বলা হয়, পর্যটন কেবল কোনো স্থানে ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পরিচিতি এবং পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
৫ ও ৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পর্যটনশিল্পের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাবনা নিয়ে ১৩টি আলোচনাপর্ব রাখা হয়েছে। এতে নতুন পর্যটনবাজার, ওমরাহর ভবিষ্যৎ, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), হালাল খাদ্যসংস্কৃতি, ইসলামি ঐতিহ্য এবং মুসলিমবান্ধব পর্যটন স্বীকৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পেয়েছে।
সম্মেলনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, মুসলিমবান্ধব পর্যটনশিল্পের আন্তর্জাতিক পরিসর বাড়াতে চারটি কৌশলগত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিনিময়। এর মাধ্যমে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে পর্যটন অবকাঠামো, ডিজিটাল প্রচার, বাজার সম্প্রসারণ এবং দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে পাহাং পর্যটন বিভাগ এবং কিংস পার্ক গেন্টিং হাইল্যান্ডসের মধ্যে সমঝোতার লক্ষ্য হচ্ছে পাহাংয়ের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গেন্টিং হাইল্যান্ডসকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা।
অন্যদিকে, ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টার, কিংস পার্ক গেন্টিং হাইল্যান্ডস এবং রিতা সিনার্জি হোল্ডিংস এসডিএন বিএইচডির মধ্যে আরেকটি সমঝোতা হয়েছে। এর আওতায় গেন্টিং হাইল্যান্ডসে আন্তর্জাতিক মানের উন্নত মুসলিমবান্ধব পর্যটন পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এ ছাড়া কানাডাভিত্তিক হালালি অ্যাপ লিমিটেডের সঙ্গে ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টারের চুক্তিতে ডিজিটাল সমন্বয় ও বৈশ্বিক প্রচারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। চীনের হালাল সার্টিফিকেশন সার্ভিসেস (চংকিং) কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে অপর সমঝোতায় মুসলিমবান্ধব নিশ্চয়তা স্বীকৃতি কর্মসূচি (এমএফএআর) বাস্তবায়ন এবং চীনে সংশ্লিষ্ট খাতের সক্ষমতা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার পর্যটনবিষয়ক উপসচিব চুয়া চুন হোয়া, পাহাং রাজ্যের ঐক্য, পর্যটন ও সংস্কৃতিবিষয়ক নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান লিওং ইউ মান, পাহাংয়ের ওরাং কায়া ইন্দেরা পাহলাওয়ান দাতো শ্রী হাজি ওয়ান আবদুল ওয়াহিদ ওয়ান হাসানসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ সম্মেলনের মাধ্যমে পাহাংয়ের পর্যটন সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও পরিচিতি পাবে। একই সঙ্গে মুসলিমবান্ধব পর্যটন খাতে নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব এবং বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রবাহ বাংলা নেটওয়ার্ক