ইতালিতে কাজ করতে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের জন্য নতুন একটি সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। দেশটির অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদ বা আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় অনুমোদিত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা বিদেশি কর্মীরা প্রচলিত বার্ষিক কর্মী নিয়োগ কোটার বাইরে ইতালিতে কাজের জন্য প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন। বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতালীয় ভাষা, দেশটির সমাজ ও আইন সম্পর্কে ধারণা এবং নির্দিষ্ট পেশায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে আগ্রহীদের ইতালির শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরে প্রায় পাঁচ লাখ বিদেশি কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে ইতালি। দেশটির সরকারি কর্মী নিয়োগ পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সময়ে মোট ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০ জন বিদেশি কর্মীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে এই সংখ্যা শুধু বাংলাদেশিদের জন্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত মোট কোটা।
তিন বছরে প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী নেবে ইতালি
ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬–২০২৮ মেয়াদে বিদেশি কর্মী প্রবেশের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে- ২০২৬ সালে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫০ জন, ২০২৭ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন, ২০২৮ সালে: ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫০ জন।
এই নিয়োগের আওতায় কৃষি, পর্যটন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, নির্মাণ, পরিবহনসহ বিভিন্ন উৎপাদন ও সেবামূলক খাতের কর্মীদের সুযোগ রয়েছে। নিয়োগের একটি বড় অংশ মৌসুমি এবং অন্য অংশ অমৌসুমি ও স্বনিয়োজিত কাজের জন্য নির্ধারিত।
এই কর্মী নিয়োগ কার্যক্রম ইতালিতে ‘দেক্রেতো ফ্লুসি’ নামে পরিচিত। প্রচলিত ব্যবস্থায় ইতালির নিয়োগকর্তাকে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করতে হয়। আবেদন অনুমোদিত হলে কর্মীর জন্য কাজের অনুমতিপত্র বা ‘নুল্লা ওস্তা’ দেওয়া হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্মী নিজ দেশে ইতালীয় দূতাবাস বা কনস্যুলেটে ভিসার আবেদন করেন।
আর্টিকেল ২৩: প্রচলিত কোটার বাইরে যাওয়ার সুযোগ
ইতালির অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বিদেশে পেশাগত ও নাগরিক-ভাষাগত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা কর্মীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রকল্প সম্পন্নকারীরা প্রচলিত দেক্রেতো ফ্লুসি কোটার বাইরে কাজের উদ্দেশ্যে ইতালিতে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন।
এ ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, ইতালির যেসব খাতে কর্মীর চাহিদা রয়েছে, সেসব খাতের জন্য বিদেশেই দক্ষ কর্মী তৈরি করা। এতে কর্মীরা ইতালিতে যাওয়ার আগেই ভাষা, কাজের দক্ষতা ও দেশটির সামাজিক নিয়মকানুন সম্পর্কে ধারণা পান।
ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, এ ধরনের প্রশিক্ষণ প্রকল্প অবশ্যই অনুমোদিত হতে হবে। প্রকল্পের প্রস্তাব নির্ধারিত সরকারি প্ল্যাটফর্মে জমা দেওয়ার পর আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি তা যাচাই ও মূল্যায়ন করে। শুধু কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রশিক্ষণ সনদ থাকলেই আর্টিকেল ২৩-এর সুবিধা পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশে শুরু হয়েছে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম
ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসের উদ্যোগে ৩ নভেম্বর ‘ল্যাঙ্গুয়েজ, সিভিক অ্যান্ড প্রফেশনাল ট্রেনিং ফর স্কিলড মাইগ্রেশন টু ইতালি’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে ইতালি ও বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ইতালীয় দূতাবাসের ৪ নভেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় ইতালীয় বেসরকারি খাতের উদ্যোগে প্রথম পর্যায়ের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হয়েছে। অনুষ্ঠানে এ ধরনের প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

প্রশিক্ষণ প্রকল্প পরিচালনায় যুক্ত রয়েছে ‘ফ্রন্তিয়েরে স্কিলস’ এবং ‘ফরমাত’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রকল্পের মধ্যে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও আতিথেয়তা খাতের কাজ এবং বস্ত্রশিল্প-সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ রয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের ইতালীয় ভাষা, নাগরিক শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট পেশার দক্ষতা শেখানো হচ্ছে।
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব প্রশিক্ষণ প্রকল্পে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ফি নেওয়া হবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশিক্ষণের ব্যয় বহন করবে। আগ্রহীদের প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিজ উদ্যোগে আবেদন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আবেদন করা নিষিদ্ধ বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।
প্রশিক্ষণ নিলেই কি ইতালি যাওয়া নিশ্চিত?
না। এ বিষয়টি আগ্রহীদের বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। অনুমোদিত প্রশিক্ষণ শেষ করলেই ইতালির ভিসা বা চাকরি নিশ্চিত হয় না।
প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর ইতালির কোনো নিয়োগকর্তাকে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে চাকরির জন্য নির্বাচন করতে হবে। এরপর নিয়োগকর্তা ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘আলি’ পোর্টালে কর্মীর নামে কাজের অনুমতিপত্র বা ‘নুল্লা ওস্তা’র আবেদন করবেন।
ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট অভিবাসন দপ্তর সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে কাজের অনুমতিপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। তবে নির্দিষ্ট কিছু দেশের আবেদন এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরীক্ষা বা ব্যতিক্রমী নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে।
নুল্লা ওস্তা পাওয়ার পর কর্মীকে ইতালীয় দূতাবাসে কাজের ভিসার আবেদন করতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে ভিসার আবেদন করার বিধান রয়েছে। ইতালির কূটনৈতিক মিশন সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে ভিসার আবেদন নিষ্পত্তির কথা বলেছে। তবে ভিসা দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দূতাবাসের।
অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষণ, নিয়োগকর্তার চাকরির প্রস্তাব, কাজের অনুমতি এবং ভিসা, প্রতিটি ধাপ আলাদা। কোনো একটি ধাপ সম্পন্ন হলেই পরবর্তী ধাপ নিশ্চিত হয়ে যায় না।
ইতালিতে পৌঁছানোর পর কী করতে হবে?
কাজের ভিসা নিয়ে ইতালিতে প্রবেশের পর কর্মীকে নির্ধারিত নিয়মে বসবাসের অনুমতিপত্র বা ‘পারমেসো দি সোজ্জর্নো’র জন্য আবেদন করতে হবে। ইতালির নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণত প্রবেশের আট দিনের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়। নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে নির্ধারিত চুক্তিও সম্পন্ন করতে হবে।

বসবাসের অনুমতিপত্রের মেয়াদ চাকরির চুক্তি ও সংশ্লিষ্ট নিয়মের ওপর নির্ভর করে। বৈধভাবে দীর্ঘদিন বসবাসের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক অনুমতিপত্রের জন্য আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট সময়ের বৈধ বসবাস, আয়, বাসস্থান ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়।
দালালের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ
ইতালিতে কাজের সুযোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে আয়োজকদের বক্তব্যের বরাতে বলা হয়েছে, কিছু দালাল ইতালির ভিসা ও চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়ার নামে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত দাবি করে। ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশীকে প্রতারিত করা হয়।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ হলো, প্রশিক্ষণ প্রকল্পের অনুমোদন যাচাই না করে কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া যাবে না। কেউ আর্টিকেল ২৩-এর নামে চাকরি বা ভিসা নিশ্চিত করার দাবি করলে সতর্ক হতে হবে। প্রশিক্ষণ প্রকল্পে আবেদন করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি এবং ইতালির দূতাবাস ও বাংলাদেশ সরকারের নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুসরণ করতে হবে।
ইতালীয় দূতাবাসের অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়েছে, আর্টিকেল ২৩-এর প্রশিক্ষণ প্রকল্পের সংখ্যা ও আসন সীমিত। তাই সবাইকে প্রশিক্ষণে নেওয়া বা ইতালিতে পাঠানো সম্ভব হবে না। নির্বাচিত না হলে অপেক্ষা করা বা দেশে থেকেই দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগ্রহীদের এখন কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?
যারা বাংলাদেশ থেকে ইতালি বা ইউরোপের অন্য দেশে কাজ করতে যেতে চান, তাদের জন্য ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন এখন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ইতালির ক্ষেত্রে আগ্রহীরা কয়েকটি বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে, তা হলো- ১. ইতালীয় ভাষার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করা। ২. হোটেল, রেস্তোরাঁ, কৃষি, নির্মাণ বা বস্ত্রশিল্পের মতো কোনো নির্দিষ্ট খাতে বাস্তব দক্ষতা অর্জন করা। ৩. শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ সনদ, পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র প্রস্তুত রাখা। ৪. আর্টিকেল ২৩-এর অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রকল্পের বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করা। ৫. ইতালির দূতাবাস, বাংলাদেশ সরকারের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং সরকারি অভিবাসন-সংক্রান্ত সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা।
ইতালিতে বৈধভাবে কাজ করতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভাষা ও দক্ষতার পাশাপাশি সঠিক তথ্য জানা এবং ধৈর্য ধরে প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি। নতুন এই প্রশিক্ষণ উদ্যোগ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাবনার একটি পথ তৈরি করেছে। তবে সুযোগটি সীমিত এবং প্রতিযোগিতামূলক। তাই কোনো দালালের কথায় বড় অঙ্কের টাকা না দিয়ে সরকারি অনুমোদন ও নিয়োগের প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়াই নিরাপদ।
| তথ্যসূত্র: ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ইতালীয় দূতাবাস ঢাকা, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাদেশ মনিটর।