ফুটপাতে শ্রমিকের মৃ`ত্যু: দুই হাজার টাকার মুচলেকায় সেই কিশোরের জামিন
রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণশ্রমিককে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগে আটক ১৭ বছর বয়সী কিশোরকে দুই হাজার টাকা মুচলেকায় জামিন দিয়েছেন আদালত। গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা, উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অতিরিক্ত বন্দীর চাপ এবং শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিয়ে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এ আদেশ দেওয়া হয়।
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিচারক উভয় পক্ষের শুনানি শেষে কিশোরটির জামিন মঞ্জুর করেন। তার বাবা ও একজন আইনজীবীর জিম্মায় জামিন দেওয়া হয়েছে।
আদালতের আদেশে বলা হয়, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় কিশোরটির শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হয়েছে। তার বিশেষায়িত চিকিৎসা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যা প্রয়োজন। কিন্তু টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৩০০ জন হলেও সেখানে বর্তমানে ১ হাজার ১৯ জন শিশু রয়েছে। জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া কেন্দ্রে অবস্থানকালে কিশোরটির শৃঙ্খলাবোধ ও আচার-ব্যবহার সন্তোষজনক ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নপত্রে তার পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টিও উঠে আসে। এসব বিবেচনায় তার সর্বোত্তম স্বার্থ ও মানবিক দিককে গুরুত্ব দিয়ে আদালত জামিনের সিদ্ধান্ত নেন।
শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৮ অক্টোবর কিশোরটির তীব্র জ্বর ও অতিরিক্ত বমি শুরু হয়। প্রথমে তাকে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।
চিকিৎসার নথিতে তার অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, মাথায় আঘাত এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া শ্রবণশক্তি হারানোর বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। পরীক্ষায় রক্তে সিরাম ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ৪ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার এবং সিরাম বিলিরুবিনের মাত্রা ৫ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার পাওয়া যায়। আদালতের পর্যবেক্ষণে এসব ফলাফল কিডনি ও যকৃতের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর জটিলতার আশঙ্কা নির্দেশ করে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কার উঠে গেলে নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান (২৪) ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁর বাড়ি নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় গ্রামে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই মোক্তাদীর ইসলাম গুলশান থানায় মামলা করেন।
পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত কিশোর ঢাকার গুলশানের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী। দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন তাকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হলেও পরে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ। এরপর গত ২৪ সেপ্টেম্বর আদালতের নির্দেশে তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
সেদিনই তার পক্ষে জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা নামঞ্জুর করেন। পরবর্তী শুনানিতে কিশোরটির আইনজীবী দাবি করেন, দুর্ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা তাকে মারধর করে এবং গুরুতর আহত অবস্থায়ও যথাযথ চিকিৎসা পায়নি। তবে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করে। উভয় পক্ষের বক্তব্য ও দাখিল করা নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালত এবার জামিন মঞ্জুর করেন।













