সীমান্ত অপরাধ দমনে কাগুজে অঙ্গীকার নয়, কার্যকর পদক্ষেপ চায় মালয়েশিয়া
আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে শুধু চুক্তি ও অঙ্গীকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে মালয়েশিয়া। সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, অর্থ পাচার, মানব পাচার এবং সহিংসতা ও চরমপন্থার হুমকি মোকাবিলায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময়, যৌথ তদন্ত ও কার্যকর অভিযান জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে দেশটি।
২০ অক্টোবর, ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত আন্তঃসীমান্ত অপরাধবিষয়ক আসিয়ানের ২০তম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে (এএমএমটিসি-২০) মালয়েশিয়ার জাতীয় বিবৃতিতে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে বলেন, আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ধরন দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। অপরাধী চক্রগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার করে তাদের কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত ও সুসংগঠিত করছে। এ ধরনের অপরাধ কোনো একক দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা জরুরি।
সাইবার অপরাধ ও অনলাইন প্রতারণা মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে বলা হয়, ২০২৬ সালের মার্চে দেশটিতে জাতীয় সাইবার অপরাধ কেন্দ্র (এনএসআরসি) চালু করা হয়েছে। ৯৯৭ হটলাইনের মাধ্যমে কেন্দ্রটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কেন্দ্রটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত করা হয়েছে। এর ফলে প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ দ্রুত শনাক্ত করা এবং তা জব্দ করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া ক্রমবর্ধমান সাইবার হুমকি মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশটির সংসদের উভয় কক্ষে সাইবার অপরাধবিষয়ক বিল পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৯৯৭ সালের কম্পিউটার অপরাধ আইন প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়ার বক্তব্যে বলা হয়, অপরাধলব্ধ অর্থ কয়েক মিনিটের মধ্যেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর করা সম্ভব। অথচ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সময় লাগে। এ ব্যবধান কমাতে অপরাধের অর্থ শনাক্তকরণ, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং তদন্তের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠায় দেশগুলোর দ্রুত সহযোগিতা প্রয়োজন।
অবৈধ অর্থ পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও অনলাইন প্রতারণার অর্থায়ন বন্ধে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে মালয়েশিয়া।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) ও এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের যৌথ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে মালয়েশিয়াকে ‘নিয়মিত অনুসরণ’ পর্যায়ে রাখা হয়েছে। আইনগত, আর্থিক, অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও গোয়েন্দা তথ্যসংক্রান্ত ক্ষেত্রে দেশটির অগ্রগতির প্রতিফলন হিসেবে এই অবস্থানকে তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের এপ্রিলে কুয়ালালামপুরে অবৈধ অর্থ পাচারবিষয়ক আসিয়ান ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠক আয়োজন করে মালয়েশিয়া।
এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে মালয়েশিয়া আসিয়ান সদস্যদের মধ্যে তথ্য বিনিময়, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মানব পাচার ও সংশ্লিষ্ট আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
অনিয়মিত অভিবাসনের পথ ব্যবহার করে আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্রগুলোর তৎপরতা ঠেকাতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও অব্যাহত রেখেছে মালয়েশিয়া।
এ লক্ষ্যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণবিষয়ক মালয়েশিয়া ঘোষণা, ২০২৬-২০৩৫ মেয়াদের আসিয়ান কর্মপরিকল্পনা এবং মালাক্কা ঘোষণার মতো উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়।
তবে এসব উদ্যোগ ও কাঠামোকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ জন্য আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সামনে তিনটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেছে মালয়েশিয়া। এগুলো হলো, অনলাইন প্রতারণা ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ ঠেকাতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণসহ তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সদস্যদেশ ও সহযোগী অংশীদারদের মধ্যে মাঠপর্যায়ের কার্যকর সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা।
বৈঠকে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয়, আসিয়ানের সাফল্য শুধু কতগুলো চুক্তি বা সমঝোতা হয়েছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। বরং কতটি অপরাধী চক্রের তৎপরতা বন্ধ করা গেছে, কতজন ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়েছে এবং কতজন অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হবে সেগুলো।
মালয়েশিয়ার বক্তব্যে আরও বলা হয়, আঞ্চলিক সহযোগিতার সুফল কাগজে-কলমে অঙ্গীকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এ সহযোগিতা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাস্তব ভূমিকা রাখতে হবে।
বিবৃতিতে মালয়েশিয়া আসিয়ান সদস্যদেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করে আরও নিরাপদ, সুরক্ষিত ও সংকট মোকাবিলায় সক্ষম অঞ্চল গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।










