ডাকসু'র নির্বাচন
ছাত্রশিবিরের নিরঙ্কুশ বিজয়, ছাত্রদলের বিপর্যয় -পেছনের কারণ কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সমর্থিত প্রার্থীরা প্রায় নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ডাকসুর সর্বোচ্চ নেতৃত্বে তারা অবস্থান নিশ্চিত করল।
ফলাফলে দেখা যায়, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদে শিবির-সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। বিশেষ করে ভিপি পদে সাদিক কায়েম তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল-সমর্থিত প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খানের চেয়ে নয় হাজারেরও বেশি ভোটে জয়ী হয়েছেন। প্রায় সব আসনেই এমন ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রকাশ্য রাজনীতিতে শিবিরের উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান তাদের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করে দেয়। আন্দোলনের পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বে শিবিরের সক্রিয় ভূমিকা ছিল—এমন ধারণাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সেটিই নির্বাচনে জয়লাভের বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
এ ছাড়া, অনেকে অভিযোগ করছেন—বিগত সময়ে অন্য সংগঠনের নাম ব্যবহার করে এবং পদ-পদবি ধারণ করেও শিবিরের নেতাকর্মীরা কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তারা প্রকাশ্যে নিজেদের পরিচয় নিয়ে সামনে আসেন।
চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর নতুন ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “যে মতাদর্শেরই হোক, সবাই মিলে কাজ করাই হবে আমাদের লক্ষ্য।” তিনি জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণ করে এই বিজয়কে সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা হিসেবে বর্ণনা করেন।
ডাকসুর নবনির্বাচিত জিএস ও শিবিরের ঢাবি শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদ বলেন, “শিক্ষার্থীরা যাকে যোগ্য মনে করেছেন তাকেই ভোট দিয়েছেন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, গত এক বছরে গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে তৈরি হওয়া ন্যারেটিভই ভোটারদের বড়ভাবে প্রভাবিত করেছে। তার মতে, আন্দোলনের মূল পরিকল্পনা, স্লোগান এবং প্রচার কৌশলে শিবির অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও তখন তারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করেনি—এটি ছিল কৌশলগত বিষয়।
অন্যদিকে ডাকসুর সাবেক জিএস মুশতাক হোসেন মনে করেন, স্বাধীনতার পর থেকে প্রচলিত ধারার রাজনীতি নিয়ে শিক্ষার্থীরা অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। বৈষম্য ও হতাশার প্রেক্ষাপটে ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোকে একটি সুযোগ দিতে তরুণরা আগ্রহী হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি শিবির ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী পথে যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে উঠতে দেরি হবে না।”
নব্বইয়ের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির কার্যত নিষিদ্ধ হলেও তারা গোপনে রাজনীতি চালিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির আন্দোলনের সময় তাদের সঙ্গে সাধারণ ছাত্রদের সংঘর্ষও ঘটে। এরপর থেকেই ক্যাম্পাসে শিবিরের ওপর একটি অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারি থাকে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে এস এম ফরহাদ নিজেকে শিবিরের ঢাবি শাখার সভাপতি হিসেবে পরিচয় দেন। এর আগে সামাজিক মাধ্যমে তার ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও ওঠে, যদিও শিবির তা অস্বীকার করে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ সময় গোপনে সক্রিয় থাকার পর এবারের নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রকাশ্য ও নিরঙ্কুশ বিজয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির চিত্র এক নতুন মোড় নিয়েছে।
ছাত্রদলসহ অন্যদের পরাজয়ের কারণ কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সামনের সারির কয়েকজন নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটে সফল হতে পারেননি তারা। একইভাবে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ছাত্রদলও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনকারী অনেক নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তরুণ ভোটাররা এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করায় তারা ব্যালট বাক্সে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রী হলগুলোতে অধিকাংশ ভোট ইসলামী ছাত্র শিবির-সমর্থিত প্রার্থীদের দিকে গেছে। অর্থাৎ নারী ভোটারদের বড় অংশও শিবিরকে বেছে নিয়েছেন।
তার মতে, গত এক বছরে ক্ষমতার পালাবদল ও অগাস্টের পরবর্তী পরিস্থিতি ভোটারদের ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শিক্ষার্থীরা চিন্তা করেছেন—কোন সংগঠন বা শক্তি বাস্তবে সরকার পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করছে, কার হাতে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ। “ভোটাররা সব সময়ই ভাবেন, আমার ভোট নষ্ট হবে না তো? যার জয়ের সম্ভাবনা বেশি তাকেই ভোট দেব”—বলেছেন অধ্যাপক নাসরীন।
দেশের স্বাধীনতার পর নবমবারের মতো অনুষ্ঠিত ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে এই ধরণের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ছাত্রদল-সমর্থিত ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাবেক নেতা উমামা ফাতেমা।













