মিশরে চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা,কায়রো বিমানবন্দরে চরম ভোগান্তি
মিশরের ঐতিহ্যবাহী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে পড়ে কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ফেসবুক বা বিভিন্ন গ্রুপে প্রচারিত “কায়রো টু ঢাকা ফ্রি টিকিট’ স্বর্ণ,’ফ্রেশ মালামাল” কিংবা “১০০% রিস্কমুক্ত মালামাল পরিবহন”এ ধরনের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিচ্ছেন অনেকেই। বিষয়টি এখন আর শুধু কতিপয় শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মিশরে অবস্থানরত পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির ওপর। বিমানবন্দরে বাংলাদেশি যাত্রীদের প্রতি বাড়তি নজরদারি, দীর্ঘ নিরাপত্তা তল্লাশি এবং কঠোর যাচাই-বাছাই এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সম্প্রতি কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ভ্রমণের সময় বাংলাদেশি যাত্রীরা নজিরবিহীন হয়রানির মুখোমুখি হন। বিশেষ করে গত ১ জুলাই দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে টার্মিনাল-২ থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি ফ্লাইটের প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা তল্লাশির বাইরেই ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনেককে দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত লাগেজসহ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি শুরুতে বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট দেখেই কয়েকজন যাত্রীর লাগেজ গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পরবর্তীতে বারবার অনুরোধের পর বাংলাদেশি যাত্রীদের একসঙ্গে নির্ধারিত একটি গেট দিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেকেই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজনীয় মালামাল বিমানবন্দরেই ফেলে যেতে বাধ্য হন।
নিয়ম অনুযায়ী ৪৬ কেজি পর্যন্ত চেক-ইন লাগেজ বহনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হয়রানি এড়াতে অনেকে মাত্র ৭-৮ কেজির হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে দেশে রওনা দেন। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফ্লাইট মিস হওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ পরিস্থিতির অন্যতম মূল কারণ হলো কিছু যাত্রীর লাগেজে ব্যক্তিগত ব্যবহারের সীমা অতিক্রম করে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ কসমেটিকস, ওষুধ ও অন্যান্য পণ্য বহন করা। তল্লাশিতে কোনো একটি লাগেজে ১০০ থেকে ২৮০টি পর্যন্ত নিভিয়া ক্রিম, আবার কোথাও পুরো লাগেজ জুড়ে শ্যাম্পু, সাবান, গুঁড়ো দুধ, বডি স্প্রেসহ বিভিন্ন কসমেটিকস পণ্য পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সীমিত পরিমাণ পণ্য বহন বৈধ হলেও, যাত্রীর ব্যক্তিগত লাগেজকে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন নীতিমালার স্পষ্ট পরিপন্থী।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এত কিছুর পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো প্রকাশ্যে “কায়রো টু ঢাকা, ১০০% রিস্কমুক্ত মালামাল” এ ধরনের প্রলোভনমূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। অতিরিক্ত আয়ের আশায় অনেক শিক্ষার্থী ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। কিন্তু বিমানবন্দরে মালামাল জব্দ হলে বা বহনের অনুমতি না মিললে মূল সিন্ডিকেট বা ব্যবসায়ীদের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না; বরং অপমান, হয়রানি, আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক চাপের পুরো বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদেরই।
এ ধরনের বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্যে ইবনে আজহার ও আহমেদ উল্লাহ নামের দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে আহমেদ উল্লাহ বলেন, “আমি শুধু খেজুর, কসমেটিকস, শ্যাম্পু ও নিভিয়া ক্রিম পাঠাতাম। এখন আর পাঠাব না। কারণ বর্তমানে অনেকেই এর আড়ালে অবৈধ মাদক বা নিষিদ্ধ পণ্য পাঠানোর চেষ্টা করছে। গত পরশু বিমানবন্দরে একজনের পাসপোর্টও আটক করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইবনে আজহার বলেন, “আমরা শুধু ফ্রেশ মালামাল কিনে দেই। যাত্রীরা রওনা হওয়ার আগে সবকিছু দেখে নেওয়ার সুযোগ পান। আমরা কোনো ধরনের ওষুধ দিই না। কায়রো থেকে ঢাকা পর্যন্ত যাত্রী যত কেজি মালামাল বহন করেন, সে অনুযায়ী কেজিপ্রতি পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, “পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, কায়রো বিমানবন্দরে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলেই অনেক কর্মকর্তা ধরে নেন—এই যাত্রী হয়তো অবৈধ ওষুধ কিংবা বিপুল পরিমাণ কসমেটিকস বহন করছেন। ফলে অনেককে অযথা দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা হচ্ছে, এমনকি কারও কারও ফ্লাইটও বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, “নতুন শিক্ষার্থীদের দেশে যাওয়ার যাত্রা সহজ করার নামে কিছু তথাকথিত ‘বড় ভাই’ সস্তা ও বিভ্রান্তিকর আশ্বাস দিয়ে তাদের এ কাজে উৎসাহিত করছেন। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির সুনাম। আল-আজহারের সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও এখন অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।
তবে এর প্রভাব শুধু পণ্য বহনকারী যাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার নিয়ে দেশে ফেরা প্রবাসী, পর্যটক কিংবা বৈধভাবে ব্যক্তিগত মালামাল বহনকারী সাধারণ বাংলাদেশি যাত্রীরাও এখন বিমানবন্দরে বাড়তি তল্লাশি,জিজ্ঞাসাবাদ এবং চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
সচেতন মহলের মতে, সাময়িক আর্থিক লাভের আশায় এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া থেকে সবার বিরত থাকা জরুরি। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। বিশেষ করে মিশরে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের মেধা, শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে যে গৌরবময় সম্মান অর্জন করেছেন, তা যেন কিছু অসচেতন ব্যক্তির অপতৎপরতার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। এমনটাই প্রত্যাশা প্রবাসীদের।












