ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ: এর জন্য কি দায়ী এল নিনো, নাকি আরও গভীর কোনো কারণ?
জুন মাসে ফ্রান্সের বড় অংশে দ্বিতীয় তাপপ্রবাহ চলাকালে প্যারিসে তাপমাত্রা বৃদ্ধির মধ্যে আইফেল টাওয়ারের কাছে ট্রোকাডেরো স্কোয়ারে একজন মহিলা। ছবি- রয়টার্স।
রেকর্ড গরমে বিপর্যস্ত ইউরোপ
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ আবারও ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মুখোমুখি। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল, জার্মানি, বেলজিয়াম ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও পারদের স্তম্ভ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে, যা জুন মাসের জন্য অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
এই তাপপ্রবাহ শুধু আবহাওয়ার খবরেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, জনস্বাস্থ্য, পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর। ইউরোপের বহু শহরে মানুষকে দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

এল নিনো কি এই গরমের প্রধান কারণ?
অনেকের মনে প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান তাপপ্রবাহের জন্য কি এল নিনো দায়ী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো কিছুটা ভূমিকা রাখলেও এটিই একমাত্র বা প্রধান কারণ নয়। এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতা, যা বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন আনে। এর প্রভাব পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা অথবা অতিবৃষ্টির মাধ্যমে দেখা যায়।
তবে ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানীরা আরও বড় একটি কারণের দিকে ইঙ্গিত করছেন—জলবায়ু পরিবর্তন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট
বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশগুলোর একটি। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
এই উষ্ণতা শুধু গড় তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে না, বরং চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোকেও আরও ঘনঘন ও তীব্র করে তুলছে। ফলে আগে যেখানে কয়েক দশকে একবার তাপপ্রবাহ দেখা যেত, এখন তা প্রায় প্রতি বছরই ঘটছে।

‘হিট ডোম’ কী?
বর্তমান তাপপ্রবাহের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো “হিট ডোম” বা তাপগম্বুজ।
এটি এমন একটি আবহাওয়াগত অবস্থা, যেখানে উচ্চচাপ বলয় একটি অঞ্চলের ওপর দীর্ঘ সময় অবস্থান করে। ফলে উষ্ণ বায়ু আটকে যায় এবং তা বের হতে পারে না। সূর্যের তাপে সেই বায়ু আরও উত্তপ্ত হতে থাকে।
এই অবস্থায় মেঘ তৈরি কম হয়, বৃষ্টিপাত হ্রাস পায় এবং তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ইউরোপের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে বর্তমানে এমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে।
কেন প্যারিসে কখনও কখনও সেভিয়ার চেয়েও বেশি গরম?
সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে দেখা গেছে, স্পেনের সেভিয়ার তুলনায় ফ্রান্সের প্যারিসে তাপমাত্রা বেশি হতে পারে।
এর কারণ হলো, ইউরোপের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বহু শহর এমন তাপমাত্রার জন্য প্রস্তুত নয়। দক্ষিণ ইউরোপে দীর্ঘদিন ধরেই গরম আবহাওয়া স্বাভাবিক হলেও ফ্রান্স, জার্মানি বা যুক্তরাজ্যের অনেক শহরে পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই।
ফলে একই তাপমাত্রা দক্ষিণ ইউরোপের তুলনায় উত্তর ইউরোপে বেশি কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে।

জনজীবনে বাড়ছে দুর্ভোগ
তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
ফ্রান্সে বহু স্কুলে ক্লাসের সময় কমিয়ে আনা হয়েছে। ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে নির্মাণশ্রমিকদের দুপুরের কাজ সীমিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্পেনে বয়স্ক মানুষ এবং শিশুদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং হৃদরোগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে চাপ
তীব্র গরম কৃষি খাতের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যাচ্ছে, ফলে ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গম, ভুট্টা, ফল এবং আঙুরের উৎপাদন কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে খাদ্যপণ্যের দামও বৃদ্ধি পেতে পারে।
দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে
গরমের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দাবানলের আশঙ্কাও বেড়ে যাচ্ছে।
স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস এবং ইতালির বনাঞ্চলগুলোতে আগুন লাগার ঝুঁকি বর্তমানে অনেক বেশি। উচ্চ তাপমাত্রা, শুষ্ক বাতাস এবং কম বৃষ্টিপাত দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান তাপপ্রবাহ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি এমন একটি প্রবণতার অংশ, যা আগামী বছরগুলোতে আরও ঘনঘন দেখা যেতে পারে।
যদি বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো না যায়, তাহলে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও দীর্ঘস্থায়ী, তীব্র এবং প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবের একটি স্পষ্ট উদাহরণ, যা মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং পরিবেশের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে।










