ইউরোপীয় শেঙেন ব্যবস্থার অবাধ চলাচলে নতুন সংকট
অভিবাসন ঠেকাতে ফ্রান্স-জার্মানি সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি জোরদার
ইউরোপের দুই প্রভাবশালী দেশ ফ্রান্স ও জার্মানি আবারও অভ্যন্তরীণ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে। সন্ত্রাসবাদ, অনিয়মিত অভিবাসন, মানবপাচার এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির অজুহাতে দুই দেশই সীমান্তে পরিচয় যাচাই ও তল্লাশি কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের শেঙেন ব্যবস্থার মূল চেতনা, অর্থাৎ অবাধ চলাচলের নীতিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ফ্রান্স ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটির অভ্যন্তরীণ সীমান্তে পরিচয় যাচাই কার্যক্রম চালু থাকবে। ফরাসি সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, জিহাদি হামলার আশঙ্কা, অনিয়মিত অভিবাসন, আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং সীমান্তসংলগ্ন নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে জার্মান সরকারও সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট দাবি করেছেন, সীমান্তে বাড়তি নজরদারির ফলে দেশে অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে বিভিন্ন নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে অনিয়মিত অভিবাসন প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। এছাড়া জার্মানির ফেডারেল পুলিশ “বুন্দেসপোলিৎসাই” জানিয়েছে, গত বছরে প্রায় ৪৭ হাজার মানুষকে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া জার্মানিতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৩৪ হাজার অভিবাসীকে সীমান্ত থেকে ফেরত পাঠানো বা বহিষ্কার করা হয়েছে।
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ সরকারের এই দাবির সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, অভিবাসন কমে যাওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহিরাগত সীমান্তে কড়াকড়ি এবং অভিবাসন রুট পরিবর্তনের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে শুধুমাত্র সীমান্ত তল্লাশিকে এর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানো বাস্তবসম্মত নয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শেঙেন অঞ্চলের অবাধ চলাচল ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ শেঙেন চুক্তির আওতায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সাধারণত পাসপোর্ট ছাড়াই যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা ও অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইউরোপের একাধিক দেশ বারবার সীমান্ত তল্লাশি পুনর্বহাল করছে।
অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, এসব তল্লাশির কারণে অনেক ক্ষেত্রে আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় বর্ণ বা চেহারাভিত্তিক তল্লাশি, আশ্রয় আবেদন গ্রহণে অনীহা এবং তাৎক্ষণিক ফেরত পাঠানোর মতো অভিযোগও উঠছে।
ইউরোপীয় আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও দীর্ঘদিন ধরে “অস্থায়ী” সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে যাওয়া শেঙেন ব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। তাদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ইউরোপে অবাধ চলাচলের ধারণাই আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।












