লন্ডনে সাংস্কৃতিক কূটনীতির অনন্য আয়োজনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পহেলা বৈশাখ
লন্ডনে সাংস্কৃতিক কূটনীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বাংলাদেশ হাইকমিশন বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপন করেছে বাংলা নববর্ষ—পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩। নর্থ লন্ডনের বাংলাদেশ হাউসে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি কেবল প্রবাসী বাংলাদেশিদের উৎসবই ছিল না, বরং এটি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আতিথেয়তা এবং অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে তুলে ধরার একটি সফল কূটনৈতিক প্রয়াস।
হাইকমিশনের এই আয়োজনে লন্ডনে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। ম্যানচেস্টার ও বার্মিংহামে অবস্থিত বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আয়োজনের ব্যাপ্তি ও গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
অতিথিদের ‘শুভ নববর্ষ ১৪৩৩’ খচিত উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নেন ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ড. এম. নজরুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, “বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব, যা আমাদের জাতিগত পরিচয় ও সম্প্রীতির বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। প্রবাসে এ ধরনের আয়োজন বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতার পর হাইকমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গান ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। সুরের মূর্ছনায় পুরো পরিবেশ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে এবং উপস্থিত অতিথিরা করতালির মাধ্যমে শিল্পীদের অভিবাদন জানান।
উৎসবের আমেজে বাংলাদেশ হাউস ও এর প্রাঙ্গণকে সাজানো হয়েছিল দারুণভাবে। প্রবেশপথেই রাখা ঐতিহ্যবাহী রঙিন রিকশা বিদেশি অতিথিদের বিশেষভাবে নজর কাড়ে। চারদিকের আলপনা, লোকজ মোটিফ এবং গ্রামীণ বাংলার নানা অনুষঙ্গ যেন প্রবাসের মাটিতেই এক টুকরো বাংলাদেশকে উপস্থাপন করছিল।
আয়োজনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। সেই লক্ষ্যে সাজানো বিভিন্ন স্টলে প্রদর্শন করা হয় বাংলাদেশের হস্তশিল্প ও লোকজ সামগ্রী। দুপুরের ভোজে পান্তা-ইলিশ, নানা পদের ভর্তা, ঝালমুড়ি, ফুচকা ও ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলির আয়োজন ছিল বাড়তি আকর্ষণ। ভিনদেশি অতিথিরা এসব খাবারের দারুণ স্বাদ গ্রহণ করেন এবং ভূয়সী প্রশংসা করেন।
দিনব্যাপী আয়োজনে শিশু-কিশোর ও পরিবারের সদস্যদের জন্য ছিল নানা বিনোদনমূলক কর্মসূচি। বড়দের জন্য ছিল ঐতিহ্যবাহী পাতিল ভাঙা ও বালিশ খেলা; অন্যদিকে শিশুদের জন্য দৌড় প্রতিযোগিতা ও বল সংগ্রহ খেলার আয়োজন ছিল প্রাণবন্ত। এ ধরনের অংশগ্রহণ প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সাংস্কৃতিক পর্বে কবিতা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান ও লোকসংগীতের পরিবেশনা ছিল মুগ্ধকর। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে করে তোলে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোররা নিজেদের শিকড় ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
লন্ডনের মনোরম আবহাওয়া, লাল-সাদা পোশাকে সজ্জিত অতিথিদের উপস্থিতি এবং বর্ণিল সাজসজ্জায় বাংলাদেশ হাউস সেদিন হয়ে উঠেছিল আনন্দ ও ঐতিহ্যের মিলনমেলা। উপস্থিত অনেক বিদেশি অতিথি মন্তব্য করেন, এই আয়োজন কেবল একটি নববর্ষ উদযাপন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।













