দেশজুড়ে হামের ভয়াল থাবা, বাড়ছে শিশুমৃত্যু ও জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ
দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন আক্রান্ত শিশু ভর্তি হচ্ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও—যা অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, অপুষ্টি এবং সচেতনতার অভাবই হামের এই পুনরুত্থানের প্রধান কারণ। অনেক শিশু নিয়মিত টিকা না পাওয়ায় তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে, ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা হাঁচি-কাশি বা সংস্পর্শের মাধ্যমে সহজেই ছড়ায়। যথাসময়ে চিকিৎসা না পেলে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা অন্যান্য জটিলতায় রূপ নিয়ে প্রাণঘাতী হতে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ‘হাম কর্নার’ চালু করা হয়েছে। সেখানে ভর্তি শিশুদের বেশিরভাগই ১৫ মাসের নিচে, এমনকি কয়েকজনের বয়স ছয় মাসেরও কম—যা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
রাজশাহী অঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মার্চ মাসেই একাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের অনেকেই নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের (আইসিইউ) অভাবে যথাযথ চিকিৎসা পায়নি। পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জেও সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত কয়েক দিনে একাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে অনেক আক্রান্ত শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকাতেও হামের বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকাই শিশুমৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুরুতর অবস্থায় থাকা অনেক শিশুকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে—
- টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি
- অপুষ্টি ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
- প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব
- জনসচেতনতার ঘাটতি
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে এবং হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে টিকা সংগ্রহ ও বাজেট বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের মাঠপর্যায়ে গিয়ে হাসপাতালের অবস্থা পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি শিশুদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা ও আইসিইউ সুবিধা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
চিকিৎসকদের মতে, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকা। শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আনা, পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং আক্রান্তদের আলাদা রাখলে সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হামের এই প্রাদুর্ভাব ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।









