পর্তুগালে আবাসন সংকট, পথে নেমেছেন হাজারো মানুষ
শনিবার বিকেলে লিসবন, পোর্তো, কইম্ব্রা, ব্রাগা, ফারোসহ কমপক্ষে ১৬টি শহরে একযোগে বিক্ষোভ হয়েছে, যার আয়োজন করেছে আবাসনের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্ম ‘Casa para Viver’ ও সহযোগী নেটওয়ার্ক ‘Porta a Porta’। “Já não dá” (আর চলছে না) স্লোগানে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ৮০–৯০টির বেশি সংগঠন ও নেটওয়ার্ক সমর্থন জানিয়েছে; আয়োজকদের ভাষ্য, বর্তমান আবাসন নীতি সংকট সমাধান না করে বরং আরও গভীর করছে। লিসবনে মিছিল শুরু হয় মেরকেশ দ্য পম্বাল ও অ্যাভেনিদা দা লিবার্দাদে ’ এবং দেশটির বিভিন্ন সহর হাজার হাজার নাগরিক বিক্ষোভে অংশ নেন।
‘বেঁচে থাকা খুব কঠিন’: ভাড়াটিয়াদের কণ্ঠ
৪৫ বছর বয়সী আনা মারিয়া জানান, ভাড়া বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে তাঁকে বাধ্য হয়ে লিসবনের এনকার্নাসাঁও এলাকায় একটি এক কামরার ছোট ঘরে উঠতে হয়েছে, যার ভাড়া মাসে ৫০০ ইউরো; আয় ও ব্যয়ের ফারাকে মাসের শেষে তাঁর হাতে প্রায় কোনো টাকা থাকে না। তাঁর কথায়, বারবার বাড়ি ছাড়ার হুমকি আসছে মালিকের কাছ থেকে এবং খাদ্য পেতে ‘Refood’–এর মতো সামাজিক উদ্যোগের সাহায্য ছাড়া তিনি চলতে পারতেন না।
অন্য এক বিক্ষোভকারী জানান, তিনি প্রায় ৩০ বর্গমিটারের স্যাঁতসেঁতে একটি বাসায় থাকেন; ১১ বছর আগে স্বামীর সঙ্গে লিসবনে আসার পর থেকে যতটুকু সঞ্চয় হয়েছে, তা দিয়ে বাড়ি কেনা কল্পনাতীত হয়ে পড়েছে। ২৩ বছর বয়সী মার্টা কোয়েলহো বলেন, চাকরি এবং স্নাতক–স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও উচ্চ ভাড়ার কারণে এখনো বাবা–মায়ের সঙ্গে একই বাসায় থাকতে বাধ্য তিনি, নিজের মতো করে শহরে থাকার সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ক্যাটরিনা সিল্ভা অভিযোগ করেন, সরকারের নতুন আবাসন নীতিতে ২৩০০ ইউরো মাসিক আয়কে ‘পরিমিত’ বলে ধরায় বাস্তবে তরুণ তরুণীদের অধিকাংশই ৩০ বছর বা তার বেশি বয়স পর্যন্ত বাবা–মায়ের বাসা ছেড়ে বেরোতে পারছেন না। আনাবেলা নামের আরেক প্রতিবাদকারী বলেন, “বেঁচে থাকা খুব কঠিন। বাড়ি ভাড়া অনেক বেশি, আমি বেকার; এই আয়ে ভাড়া ও খাবারের খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব।”
রাকেল পেরেইরা মতো অনেকেই জানাচ্ছেন, আয় কমে যাওয়া আর ভাড়া বেড়ে যাওয়ার চাপ সামলে তারা আর বর্তমান বাসায় টিকে থাকতে পারছেন না; তিনি জানিয়েছেন, সামাজিক আবাসনের জন্য আবেদন করলেও কবে অনুমোদন পাবেন এ বিষয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন এবং নির্ধারিত সময়সীমার (৩১ অক্টোবর) মধ্যেই হয়তো নতুন থাকার জায়গা খুঁজতে হবে।
সরকারের ৩০ দফা প্যাকেজ ও অভিযোগ
পর্তুগিজ সরকার আবাসন সংকট মোকাবিলায় নির্মাণ ও ভাড়াবাজারে প্রণোদনা, কর ছাড়, ভাড়া সহায়তাসহ প্রায় ৩০টি পদক্ষেপের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যাকে সরকার ‘নীতিগত ধাক্কা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। এর মধ্যে আছে মাঝারি ভাড়ার বাড়ির মালিকদের কর ছাড়, ভাড়া ব্যয়ের ওপর বাড়তি আয়কর ছাড় এবং নির্দিষ্ট মূল্যসীমার মধ্যে থাকা আবাসন নির্মাণে কম হারে ভ্যাট আরোপের মতো ব্যবস্থা।
তবে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপ আসলে বাজারে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা বাড়াচ্ছে, কিন্তু ভাড়াটিয়াদের চাপ কমাচ্ছে না; বরং বাসাভাড়া ও বাড়ির দাম আরও দ্রুত বাড়ছে। বামপন্থি ও নাগরিক সংগঠনগুলো বলছে, সরকার যে নীতিগুলোকে সমাধান হিসেবে তুলে ধরছে, সেগুলোই আগের বছরগুলোতে সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে; তাদের দাবি, শক্তভাবে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘমেয়াদি ভাড়াচুক্তি (কমপক্ষে ১০ বছর) এবং ২০১৩ সালের ‘Lei dos Despejos’ (উচ্ছেদ আইন) বাতিল না করলে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বাড়ির দাম ১৮%–২৭% পর্যন্ত বেড়েছে
সরকারি প্যাকেজের পরও গত এক বছরে আবাসন বাজারে মূল্যবৃদ্ধি থামেনি; পর্তুগালের জাতীয় পরিসংখ্যান দফতর এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ত্রৈমাসিক তুলনায় দেশে বাড়ির গড় দাম প্রায় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। কিছু প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে ‘Casa para Viver’ এর প্রচারসামগ্রীতে দাবি করা হয়েছে, প্রথম বড় প্যাকেজ ঘোষণার পর থেকে মোটামুটি ২৭ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে এবং লিসবনে প্রতি বর্গমিটারের গড় মূল্য ৫ হাজার ইউরোর বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ভাড়ার বাজারেও উচ্চচাপ বজায় আছে; বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, কর–প্রণোদনার বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত মালিক ও বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত আয় হিসেবে থেকে যাবে, ভাড়া বা বিক্রিমূল্য কমার বদলে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি ও পরবর্তী পদক্ষেপ
শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সংগঠনগুলো পরিষ্কারভাবে কয়েকটি দাবি তুলে ধরেছে—প্রথম আবাসনের মর্টগেজ কিস্তি নির্দিষ্ট সীমার (আয়–এর সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ) বেশি না রাখা, বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, অন্তত ১০ বছরের স্থিতিশীল ভাড়াচুক্তি এবং দ্রুত সামাজিক আবাসনের সংখ্যা বাড়ানো। আন্দোলনকারীরা বলছেন, পর্তুগালে প্রায় সাত লক্ষাধিক বাসা খালি থাকলেও সরকার এখনো মূল সমাধান হিসেবে বাজার–নির্ভর নীতিকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা বাস্তবে সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে। ‘Casa para Viver’ প্ল্যাটফর্ম জানিয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর প্রতিক্রিয়া না এলে এই বছর জুড়েই তারা ধারাবাহিক কর্মসূচি ও নতুন বিক্ষোভের ডাক দিতে পারে









