ইউরোপের মঞ্চে বাংলা আর মার্টিনসের মঞ্চে অভিবাসী বিজয়
ইউরোপের সাংস্কৃতিক রাজধানী লিসবনের আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবার যেন নতুন ইতিহাস লিখল বাংলা ভাষা ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের জীবনসংগ্রাম। পর্তুগালের খ্যাতনামা পরিচালক মার্কো মার্টিনসের মঞ্চনাটক Um Inimigo do Povo–তে একদিকে যেমন উঠে এসেছে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের বিতর্কিত পুলিশ অভিযানের চিত্র, অন্যদিকে তেমনি ফুটে উঠেছে বাংলাদেশি ও নেপালি অভিবাসীদের না বলা জীবনের গল্প।
এই নাটকে অংশ নেওয়া ১২ জন শিল্পীর মধ্যে ৭ জনই বাংলাদেশি নাগরিক সোহেল রানা, রাজিব আল মামুন, কামাল সরদার, সাবেরা পারভিন, সরকার নাসরিন, কামাল চৌধুরী ও নুরুল আমিন। তাদের সঙ্গে আছেন নেপালের দুই শিল্পী দিল বাহাদুর ও নিরাজ ঘাটকা এবং পর্তুগিজ অভিনেতা রদরিগো থমাস, রিতা কাবাকো ও জানেট ফার্নান্দেজ। পুরো মঞ্চজুড়ে বাংলা সংলাপ ও বাংলা গান যখন ধ্বনিত হচ্ছিল, তখন পর্তুগিজ দর্শকেরা অবাক বিস্ময়ে, কখনও বা অশ্রুসজল চোখে পুরো প্রদর্শনী উপভোগ করেছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে এটি নিঃসন্দেহে এক গৌরবময় মুহূর্ত, যা ইতোমধ্যে পর্তুগালের সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছে।
নাটকের প্রেক্ষাপটে আছে ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর লিসবনের রুয়া দো বেনফরমোসোতে পরিচালিত বিশেষ পুলিশ অভিযান। ওই দিন প্রায় ৪০০ জন অভিবাসীকে দেয়ালের সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে হাত মাথার ওপর তুলে রাখতে বাধ্য করা হয় এবং এই দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পর্তুগালজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। মানবাধিকারকর্মী ও অভিবাসী সংগঠনগুলো এটিকে বৈষম্যমূলক ও অপমানজনক আচরণ হিসেবে আখ্যা দিলেও, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে শুরুতে এটিকে “অপরাধ দমনমূলক বিশেষ অভিযান” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। পরবর্তীতে পর্তুগালের প্রোভেদোরিয়া দা জুস্তিসা এই অভিযানে পরিকল্পনা ও ব্যক্তিগত তল্লাশির ক্ষেত্রে গুরুতর ত্রুটির কথা উল্লেখ করলেও, তা জনমতের সেই প্রথম ধাক্কার তুলনায় অনেক কম আলোচনায় আসে।
এই এক টুকরো ছবি দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের দৃশ্য মার্কো মার্টিনসকে নাড়া দেয়। নরওয়েজিয়ান নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের ক্লাসিক An Enemy of the People–এর উপর ভিত্তি করে তিনি নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেন, কীভাবে মিডিয়া ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো অভিবাসীদের কণ্ঠস্বর না শুনেই তাদের “সমস্যা” বা “হুমকি” হিসেবে তুলে ধরে। পরিচালক নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাস্তবতা অনেক সময় আমাদের কাছে পৌঁছে যায় পরোক্ষভাবে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ আর রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে যেখানে অভিবাসীর নিজস্ব কণ্ঠ প্রায় অনুপস্থিত।

মার্টিনসের ভাষায়, এই অভিবাসীরা “কখনও শোনা যায় না, কখনও মঞ্চ পায় না, কখনও তাদের পরিচয় দৃশ্যমান হয় না।” দক্ষিণ এশীয়দের একঘাটে “ইন্ডিয়ান” বলে ডাকার ধরনটিকে তিনি তুলনা করেছেন যেন আইবেরিয়ান উপদ্বীপের সব মানুষকে এক নামে ডেকে তাদের ব্যক্তিত্ব মুছে ফেলার সঙ্গে। প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন প্রান্তিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করা এই পরিচালক মনে করেন, এ ধরনের সম্বোধন মূলত এক ধরণের অমানবিকীকরণ যেখানে মানুষকে আলাদা ব্যক্তিত্ব নয়, এক ধরনের বিমূর্ত “অন্য” হিসেবে দেখা হয়।
ইবসেনের মূল নাটকে একটি নরওয়েজিয়ান শহরের থার্মাল স্পা ও জনস্বার্থ অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ব্যক্তির সত্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপের সংঘাত উঠে এসেছে। মার্টিনস এই সংঘাতকে টেনে এনেছেন আজকের ইউরোপে অভিবাসন বিতর্কের প্রেক্ষাপটে। তার মতে, “নাটকের বড় লাইনটি হল সংখ্যাগরিষ্ঠ কখনই সব সময় সঠিক নয়; অনেক সময় সত্যের কাছাকাছি থাকে সেই সংখ্যালঘুরাই, যাদের কথা শোনা হয় না।” যদিও তিনি ‘সত্য’ শব্দটিকে আপেক্ষিক বলেই দেখেন, তবু এই নাটকের মাধ্যমে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন কাদের অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি, আর কাদের কথা চেপে রাখছি?
এখানে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত দ্বন্দ্বের পাশাপাশি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের ভূমিকা। কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী, বিশেষ করে অতি ডানপন্থী ও জনপ্রিয়তাবাদী শক্তি, যেভাবে অভিবাসীদের ওপর বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার দায় চাপিয়ে নিজেদের ভোট রাজনীতি সাজায়, সেটাও নাটকের অনুষঙ্গ। পরিচালক বলেছেন, তার কাজ সরাসরি “অ্যাক্টিভিজম” নয়, বরং প্রশ্ন তোলা ও দ্ব্যর্থক মনে হওয়া বিষয়গুলোকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সামনে আনা যাতে দর্শক নিজের মতো করে ভাবতে বাধ্য হয়।

নাটকের আরেকটি দিক হলো, বেনফরমোসোর ওই অভিযানে দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা প্রায় কয়েক ডজন অভিবাসীর মধ্য থেকে অন্তত একজন সরাসরি এই নাটকের অংশ হয়েছেন। অন্যদের ক্ষেত্রেও, পরিচালক মনে করিয়ে দেন তারা শারীরিকভাবে হয়তো সেদিন সেই দেয়ালে ছিলেন না, কিন্তু তাদের জীবন, ভয় ও অভিজ্ঞতা সেই একই বাস্তবতার অংশ; সামান্য সময় ও জায়গার ব্যবধানে যে কেউ সেই সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন।
মার্কো মার্টিনসের এই কাজের পেছনে রয়েছে পর্তুগালের শীর্ষ দৈনিক এক্সপ্রেসো এর দুই সাংবাদিক জোয়ানা পেরেইরা বাস্তোস ও রাকেল মোলেইরোর অনুসন্ধানী রিপোর্টিং। বেনফরমোসোর সেই অভিযানে যাদের আটকানো হয়েছিল, তাদের খুঁজে বের করা ছিল দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া; কারণ একদিকে রয়েছে ভয় ও অবিশ্বাস, অন্যদিকে রয়েছে “বাংলাদেশ নয়” লেখা পোস্টারসহ কিছু রাজনৈতিক প্রচারণা, যা অভিবাসীদের সরাসরি লক্ষ্য করে তাদের “সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অনেকের পরিবার বাংলাদেশে বসে আন্তর্জাতিক টেলিভিশন চ্যানেলে এই অভিযান দেখেছেন এবং দেয়ালে হেলান দিয়ে থাকা আপনজনকে দেখে তাকে অপরাধীর সঙ্গে এক কাতারে ভাবতে বাধ্য হয়েছেন; পরে সেই ব্যক্তি বারবার ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হয়েছেন যে তিনি কিছুই করেননি।
সাংবাদিকদের ভাষ্যমতে, অভিবাসীদের জীবনকাহিনি তুলে ধরতে গিয়ে শুধু পর্তুগালে এসে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তা নয়, বরং নিজ দেশের রাজনৈতিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ যাত্রাপথের বর্ণনা উঠে এসেছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাহায্য করেছে পর্তুগালে বাংলাদেশি কমিউনিটির কয়েকজন সদস্য, যারা দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের ডকুমেন্টেশন ও আইনি সহায়তা নিয়ে কাজ করছেন। নারী সাংবাদিক হিসেবে এই সংবেদনশীল সম্প্রদায়ের ভেতরে প্রবেশ করাও সহজ ছিল না; সাংস্কৃতিক বাস্তবতাও ছিল একটি বাড়তি বাধা।
এমন একটি প্রেক্ষাপটে লিসবনের সেন্ট্রো কালচুরাল দে বেলেঁ (CCB)–এর মতো মর্যাদাপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অভিবাসীদের কণ্ঠ, মুখ, ভাষা—সবকিছুকে সামনে আনা পর্তুগালের গণতান্ত্রিক সমাজ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। শো শেষে পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছেন দর্শকেরা; অনেকেই বলেছেন, থিয়েটার থেকে বেরিয়ে তারা আর আগের মতো নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন না।
লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জোযে মাপ্রিল এই নাটককে পর্তুগালে অভিবাসীদের দীর্ঘদিনের ভুল উপস্থাপন আর স্টেরিওটাইপের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী শিল্পিত জবাব হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, অসমতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অভিবাসীদের এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ বিশেষভাবে প্রশংসনীয়, কারণ এটি সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগান না হয়ে, গভীর মানবিক অভিজ্ঞতার ভাষায় কথা বলে।
পর্তুগালের প্রধান জাতীয় দৈনিক এক্সপ্রেসো এর উপ সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক ডাভিদ দিনিস বলেছেন, Um Inimigo do Povo নিঃসন্দেহে এক অনন্য উপস্থাপনা এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময়ের দুর্দান্ত উদাহরণ। তিনি সব শিল্পী ও কলাকুশলীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, পর্তুগাল ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ধরনের সাংস্কৃতিক সংলাপই বর্তমান ইউরোপীয় সমাজে সবচেয়ে প্রয়োজন।
পরিচালক মার্টিনস আশা করছেন, উনিশ শতকের নরওয়ে থেকে অনেক দূরের এই পর্তুগিজ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ইবসেনের নাট্যবস্তুর পুনর্নির্মাণ দর্শকদের “অস্থির” করে তুলবে। তার কাছে থিয়েটার শুধু বিনোদনের জায়গা নয়; বরং সহানুভূতি ও সমবেত চিন্তার একটি বিশেষ স্থান, যেখানে দর্শকরা ভাবতে শুরু করবেন যে মানুষটি আমাদের খাবার ডেলিভারি করে, বাস চালায় বা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করে, তার জীবন সম্পর্কে আমরা আসলে কতটা জানি।
বর্তমানে এই নাটকটি পর্তুগালের বিভিন্ন শহরে মঞ্চায়িত হচ্ছে এবং আসন্ন মাসগুলোতে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে ট্যুর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে যেমন একদিকে ইউরোপীয় থিয়েটারের মূলধারায় বাংলা ভাষা, বাংলা গান ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের জীবনকাহিনি আরও বেশি দৃশ্যমান হবে, অন্যদিকে অভিবাসী অধিকারের প্রশ্নটি নতুন আলোচনার জন্ম দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।












