পর্তুগালে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে হুহু করে উর্ধ্বগতি, ভোক্তাদের হাঁসফাঁস
ছবিঃ সংগৃহীত
ভোক্তা অধিকার সংস্থা ডেকো প্রোটেস্ট পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে পর্তুগালের মৌলিক খাদ্য ঝুড়ির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৪ দশমিক ১২ ইউরো, যা পর্যবেক্ষণ শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ মূল্য। বছরের শুরুতে এই একই ঝুড়ির জন্য যে দামে কিনতে হতো, এখন তার চেয়ে প্রায় ১২ দশমিক ৩০ ইউরো বেশি গুনতে হচ্ছে, অর্থাৎ মাত্র দুই–আড়াই মাসে প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডেকো প্রোটেস্টের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে যখন ৬৩টি অপরিহার্য খাদ্যপণ্য নিয়ে এই ঝুড়ির দাম পর্যবেক্ষণ শুরু হয়, তখনকার তুলনায় এখন পরিবারগুলোকে একই ঝুড়ির জন্য প্রায় ৬৬ ইউরো বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ চার বছরের কম সময়ে মৌলিক খাদ্য ঝুড়ির খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ, যা খাদ্যনির্ভর ব্যয়ের অংশকে পরিবারের সামগ্রিক বাজেটে আরও বড় বোঝা হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
ডেকো প্রোটেস্টের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত জুকিনি ও বাঁধাকপি সহ কয়েকটি সবজির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। প্রথম সপ্তাহের জানুয়ারির তুলনায় ঝুচিনির দাম প্রায় ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, আর বাঁধাকপি ও দোরাদা মাছের দামও ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। একই সময়ে টুনা ক্যান, ফ্রাঙ্কফুর্ট সসেজ ও পাস্তার মতো কিছু প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ক্ষেত্রেও সপ্তাহওয়ারি হিসেবে ১২ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত দামের লাফ দেখা গেছে।
পর্তুগালের খাদ্য মুদ্রাস্ফীতির সরকারি পরিসংখ্যানও ভোক্তাদের এই চাপের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রিত থাকলেও, খাদ্য খাতে মূল্যবৃদ্ধির হার এখনো সাধারণ মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় বেশি এবং বিশেষ করে অপরিশোধিত খাদ্যপণ্যে এই চাপ স্পষ্ট বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্মগুলোর তথ্য থেকে জানা যায়।
স্থানীয় মেলা ও বাজারগুলোতে ক্রেতারা বলছেন, একই আয়ে আগের মতো কেনাকাটা রাখা এখন আর সম্ভব হচ্ছে না, ফলে তারা এখন তালিকা করে কেবল প্রয়োজনীয় পণ্যই কিনছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড বদলে অপেক্ষাকৃত সস্তা বিকল্প বেছে নিচ্ছেন। অনেক পরিবার জানিয়েছে, মাসের শেষে বাজেট সামলাতে গিয়ে মাংস বা মাছের পরিমাণ কমিয়ে সবজির দিকে ঝুঁকছেন, তবু সবজি ও অন্যান্য খাদ্যের দাম বাড়ায় সাশ্রয়ের সুযোগও ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতারা আগের চেয়ে বেশি দরদাম করেন এবং অফার বা ডিসকাউন্ট আছে এমন পণ্যের খোঁজে থাকেন, ফলে বিক্রয়কৌশলও বদলাতে হচ্ছে। অনেক বিক্রেতা সতর্ক করেছেন, পরিবহন খরচ ও পাইকারি দামের চাপ কমে না এলে সামনে আরও কিছু পণ্যে দাম সমন্বয় করতে হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি হিসেবে দেখা যাবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষি উৎপাদনে ব্যাঘাত এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা মিলিয়ে পর্তুগালের খাদ্যবাজারে এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের উত্তেজনা জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যের ওপর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে, আর জ্বালানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহন সব স্তরেই অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের চূড়ান্ত দামে প্রতিফলিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির হার কিছুটা নেমে এলেও খাদ্য ও জ্বালানিএ দুই খাতে চাপ তুলনামূলক বেশি থাকায় সাধারণ মানুষ “অফিসিয়াল” মুদ্রাস্ফীতির চেয়েও বেশি চাপ অনুভব করছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত এবং আঞ্চলিক সংঘাতের সমন্বিত প্রভাব দ্রুত না কমলে খাদ্যঝুড়ির এই উচ্চ মূল্যস্তর স্বল্প সময়ে কমে আসার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।










