ট্রাম্প–পুতিনের জরুরি ফোনালাপ, ইরান যুদ্ধ নিয়ে কি কথা হয়েছিল?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তি–সম্ভাবনা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা নিয়ে সোমবার এক ফোনালাপে আলোচনা করেছেন। ক্রেমলিন জানিয়েছে, চলতি বছরে দুই নেতার মধ্যে এটি প্রথম আনুষ্ঠানিক ফোনালাপ, যেখানে ইরান সংকট দ্রুত সমাপ্তির রুশ প্রস্তাব ও বৈশ্বিক তেলের বাজারে সাম্প্রতিক ধাক্কা আলোচনায় প্রাধান্য পায়।
ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির জ্বালানি ঝুঁকি
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন আগেই সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান বৈশ্বিক জ্বালানি–সংকটকে তীব্র করেছে এবং এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইরানের হুঁশিয়ারির পর কার্যত হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে যায়, ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশ্বের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ তেলের রফতানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়, তাই এ পথ অচল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ লাফিয়ে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে এক দিনে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায় এবং বাজারে শিগগিরই ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প–পুতিন ফোনালাপ: ইরান ও ইউক্রেন ইস্যুতে আলোচনার মূল পয়েন্ট
ক্রেমলিনের পররাষ্ট্র–সহযোগী ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, সোমবারের ফোনালাপে প্রেসিডেন্ট পুতিন ইরান ঘিরে উত্তেজনা দ্রুত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পথে সমাধানের জন্য কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। এসব প্রস্তাবের মধ্যে গালফ অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনাকে জোরদার করা, ইরান ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় এবং উত্তেজনা কমাতে ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতির রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে ক্রেমলিন সূত্রের ভাষ্য।
ফোনালাপের পর ফ্লোরিডার গলফ ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, পুতিনের সঙ্গে তাঁর “খুব ভালো” কথা হয়েছে এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ইরান ইস্যুতে সহায়তা করার আগ্রহ দেখিয়েছেন। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি পুতিনকে বলেছিলেন, ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারলে সেটিই হবে বাস্তবিক অর্থে সবচেয়ে বড় সহায়তা।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও রাশিয়ার বার্তা
ইউরি উশাকভের বরাতে রুশ গণমাধ্যম জানায়, ফোনালাপে দুই নেতা ইউক্রেনের সামরিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন এবং সাম্প্রতিক রুশ অগ্রগতি শান্তি আলোচনায় কিয়েভের অবস্থান পুনর্বিবেচনায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে পুতিন মন্তব্য করেন। মস্কোর মতে, পশ্চিমা দেশগুলো যদি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের রূপরেখা নিয়ে বাস্তবসম্মত অবস্থান নেয়, তবে ইউক্রেন ইস্যুতে অচলাবস্থা কাটানোর সুযোগ এখনও রয়েছে।
পুতিন আরও ইঙ্গিত দেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী দেশ হিসেবে রাশিয়া আবারও ইউরোপীয় গ্রাহকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহযোগিতায় ফিরতে প্রস্তুত, যদি তারা পূর্বের মতো রাজনৈতিক শর্তারোপ না করে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
রুশ তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের চিন্তাভাবনা
বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাগামছাড়া বাড়তে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, বৈশ্বিক জ্বালানি–সংকট সামাল দিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ওপর জোর দিচ্ছে ওয়াশিংটন এবং এ সম্পর্কিত ঘোষণা দু–এক দিনের মধ্যেই আসতে পারে।
সূত্রগুলো জানায়, আলোচনায় দু ধরনের পথ নিয়ে ভাবা হচ্ছে—একটি হচ্ছে বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা, আরেকটি হচ্ছে ভারতের মতো নির্দিষ্ট কিছু দেশের জন্য বিশেষ ছাড় দেয়া, যাতে তারা মার্কিন শাস্তির আশঙ্কা ছাড়াই রুশ তেল কিনতে পারে। ইতোমধ্যে ভারতকে সীমিত সময়ের জন্য রুশ তেল আমদানির বিশেষ অনুমতি দেয়া হয়েছে বলে পশ্চিমা গণমাধ্যম জানিয়েছে।
ফ্লোরিডায় ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তেলের দাম কমাতে কিছু নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে এবং যেসব দেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে এসব নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হয়তো নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজনই হবে না এবং শান্তি প্রক্রিয়া এগোলে বাজারও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
হরমুজ প্রণালি–নির্ভর সরবরাহ ও সম্ভাব্য নৌ–সুরক্ষা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় হরমুজ প্রণালি–নির্ভর তেল সরবরাহে যে ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতি ও ভোক্তা–বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রফতানির বড় অংশ হঠাৎ ঝুঁকির মুখে পড়ায় পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশে জ্বালানি–মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী ও সহযোগী দেশগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সেখানকার রুটে পাহারা দেবে, যাতে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে না যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক护–কনভয় গঠন করা হলেও রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট কাটানো কঠিন হবে।
ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেন সংঘাত এবং রুশ তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা—এই তিনটি ইস্যু এখন একীভূত হয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি–রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ট্রাম্প–পুতিন ফোনালাপ একদিকে শান্তি–প্রচেষ্টার নতুন কূটনৈতিক সিগন্যাল দিলেও, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা নীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে পশ্চিমা জোটের ভেতরেও নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা









