যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে আটকে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) ব্যবহার করে আরোপ করা বৈশ্বিক পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছে, যা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে নেওয়া সবচেয়ে আলোচিত অর্থনৈতিক পদক্ষেপের বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা সম্পর্কিত এই আইন প্রেসিডেন্টকে সীমিত পরিসরে আমদানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিলেও সরাসরি শুল্ক আরোপের মতো কর আরোপের ক্ষমতা দেয় না।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ৯ সদস্যের বেঞ্চে ৬–৩ ভোটে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রক্রিয়াকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়, যেখানে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লেখেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আইইইপিএ–তে ‘আমদানি নিয়ন্ত্রণ’ শব্দগুচ্ছের মধ্যে শুল্ক আরোপকে অন্তর্ভুক্ত করে দেখার কোনো আইনি ভিত্তি নেই, ফলে আইনের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট অতিরিক্ত ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারেন না। এই মামলাটি করে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ডেমোক্র্যাটশাসিত অঙ্গরাজ্য ও শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত নানা ব্যবসায়ী সংগঠন, যারা অভিযোগ করেছিল—ট্রাম্প কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে এককভাবে আমদানি কর বাড়িয়ে সংবিধানসম্মত ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করেছেন।
রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ট্রাম্প এবং রায়কে ‘জাতির জন্য অপমানজনক’ আখ্যা দিয়ে কিছু বিচারপতিকে ‘দেশের স্বার্থের বদলে বিদেশি স্বার্থ রক্ষায় উৎসাহী’ বলেও কটাক্ষ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আদালত তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডাকে বারবার ঠেকিয়ে দিচ্ছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অন্যায় বাণিজ্যিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। রায়ের পরই তিনি ঘোষণা দেন, আইইইপিএ–র পথ বন্ধ হলেও তিনি ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২–এর আওতায় নতুন করে সব দেশের পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্কের বাইরে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ‘গ্লোবাল ট্যারিফ’ আরোপের জন্য নির্বাহী আদেশে সই করবেন।
ট্রাম্প জানান, নতুন এই ১০ শতাংশ শুল্ক বিদ্যমান শুল্কের ওপর ‘অ্যাড অন’ হিসেবে যোগ হবে এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যেসব শুল্ক সরাসরি বাতিল হয়নি, সেগুলো আগের মতোই বহাল থাকবে। ১৯৭৪ সালের আইনের এ ধারায় সাধারণত সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য অস্থায়ী শুল্ক আরোপের সুযোগ থাকলেও ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজনে কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়ে তা দীর্ঘায়িত করার পথ খোঁজা হবে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, ‘আমি চাইলে কোনো দেশের সঙ্গে পুরো বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে পারি, তাদের ওপর অবরোধ জারি করতে পারি, কিন্তু সামান্য ফি বা শুল্ক বাড়াতে গেলে এত জটিলতা—এটা অযৌক্তিক।’
ট্রাম্পের জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের পদক্ষেপের ফলে গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের গড় কার্যকর শুল্কহার কয়েক দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে যায়, যা বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, আইইইপিএ–নির্ভর এই শুল্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগারে শত শত বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আসার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল এবং এর একটি বড় অংশ এখন ফেরত দেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্র কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়।
এই পাল্টা শুল্ক–যুদ্ধে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশসহ কয়েকটি রপ্তানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশ। আগের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ছিল, যা নতুন নীতিতে অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়ে মোট কার্যকর শুল্ককে ৫০ শতাংশের বেশি পর্যায়ে ঠেলে দেয় বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ। এর ফলে তৈরি পোশাক খাতসহ দেশের প্রধান রপ্তানি খাতে অর্ডার কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিকল্প বাজারে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়।
পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ঘোষিত পাল্টা শুল্কের হার কিছুটা কমালেও সামগ্রিক শুল্কভার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থেকেই গেছে; আবার একাধিক ধাপে ৩৫–৩৭ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশের ঘরে নামিয়ে আনার আলোচনা চলে, যাতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা কিছুটা ফিরে পায়। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং তৈরি পোশাক–শিল্পসংক্রান্ত সংগঠনগুলো শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্কনীতিকে ‘বড় ধাক্কা’ উল্লেখ করে নিয়মিত আলোচনায় ছিল।
এ অবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের নতুন রায়ে আইইইপিএ ভিত্তিক শুল্ক বাতিল হওয়া বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন স্বস্তির বার্তা আনতে পারে, অন্যদিকে ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক নতুন করে উদ্বেগও বাড়াচ্ছে। কারণ, তত্ত্বগতভাবে জরুরি আইনের আওতায় আরোপিত পাল্টা শুল্ক বাতিল হলে গড় শুল্কহার কমে আসার কথা থাকলেও, নতুন আইনি ধারা ব্যবহার করে বাড়তি বোঝা চাপালে অনেক ক্ষেত্রেই সেই স্বস্তি খর্ব হয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সবকিছু নির্ভর করবে—নতুন শুল্ক কোন আইনে, কত সময়ের জন্য, কোন কোন পণ্যের ক্ষেত্রে এবং কত হারে প্রয়োগ করা হবে তার ওপর।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় শুধু ট্রাম্পের বর্তমান নীতি নয়, ভবিষ্যতে কোনো প্রেসিডেন্টের জন্যও জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের অপব্যবহার করে একতরফা শুল্ক আরোপের পথ অনেকটা বন্ধ করে দিল। তবে একই সঙ্গে তাঁরা সতর্ক করছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন কিংবা ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইনের মতো অন্যান্য ধারা ব্যবহার করে নতুন করে শুল্ক আরোপের চেষ্টা করতে পারে, যা বিশ্ববাণিজ্যে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত করবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, এখন সময় হলো দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই বাংলাদেশের পক্ষে স্থিতিশীল ও তুলনামূলক কম শুল্কের একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা। তৈরি পোশাক, কৃষি পণ্য ও ওষুধের মতো প্রধান রপ্তানি খাতে সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে বিকল্প বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য সংলাপগুলোতে এই সুপ্রিম কোর্টের রায়কে কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগানো জরুরি বলে তাঁদের মত।













