কক্সবাজার থেকে প্রথম পূর্ণমন্ত্রী
সালাহউদ্দিন আহমদের বিসিএস থেকে রাজপথ, শেষে পূর্ণমন্ত্রী
ছবিঃ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন নবগঠিত মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদকেও মন্ত্রী হিসেবে শপথ করান। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের এই মন্ত্রিসভায় তিনি পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, যেখানে মোট ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী শপথ নেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত এই বিএনপি নেতা নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন, যা তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া–পেকুয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুখকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করে বিজয়ী হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। বেসরকারি ফল অনুযায়ী, তিনি প্রায় ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিজয় লাভ করেন, যা কক্সবাজারের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ জনপ্রিয়তারই প্রতিফলন। এর আগে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে দুটি মেয়াদে এমপি এবং ২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি, যা স্বাধীনতার পর কক্সবাজার থেকে প্রথম প্রতিমন্ত্রী হওয়ার ইতিহাস গড়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে এবারই প্রথমবারের মতো কক্সবাজার থেকে কেউ পূর্ণমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন সালাহউদ্দিন, যা জেলার রাজনীতিতে এক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১৯৮৫ সালের ৭ম বিসিএস (প্রশাসন) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং বগুড়া জেলা প্রশাসনে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার গঠনের পর ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে নিয়োগ পান, যা তাকে সরাসরি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। দীর্ঘদিন কাছ থেকে আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার সান্নিধ্যে থাকার পর ১৯৯৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়ে তিনি কক্সবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন এবং একই বছর প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরপর তিনবার সংসদ সদস্য, তারপর প্রতিমন্ত্রী—এভাবে প্রশাসনিক ক্যাডার থেকে জননির্বাচিত রাজনীতিক হয়ে ওঠার বিরল উদাহরণ তৈরি করেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
২০১৫ সালে বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১০ মার্চ ঢাকায় হঠাৎ নিখোঁজ হন সালাহউদ্দিন আহমদ; পরিবার ও দলীয় নেতারা অভিযোগ করেন, তাকে গুম করা হয়েছে। দীর্ঘ ৬২ দিন পর ১১ মে ভারতের মেঘালয়ের রাজধানী শিলঙে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় তার খোঁজ মেলে এবং পরবর্তীতে সেখানে মামলা, কারাভোগ ও দীর্ঘ আইনি জটিলতার মধ্যেই তাকে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। শিলঙে অবস্থানকালে তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন, অর্থাৎ দেশ থেকে দূরে থাকলেও দলীয় সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার গুরুত্ব অটুট থাকে। প্রায় এক দশক পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট তিনি মাতৃভূমি বাংলাদেশে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন করেন, যা কক্সবাজার ও বিএনপি মহলে এক আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে আলোচিত হয়।
১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের পেকুয়া এলাকার ঐতিহ্যবাহী সিকদার পাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন সালাহউদ্দিন আহমদ; পিতা মৌলভি ছাঈদুল হক ও মাতা বেগম আয়েশা হক। ১৯৭৭ সালে পেকুয়ার শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন তিনি। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৮৪ সালে এলএলবি (সম্মান) ও ১৯৮৬ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন; বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ–সভাপতি ও কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠনিক পর্যায়ে তিনি সরাসরি কাউন্সিলের ভোটে দু’বার কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ২০১০ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন।
ব্যক্তিজীবনে চার সন্তানের জনক সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমদও রাজনীতিক; ২০০৮ সালের নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসন থেকেই তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, ফলে এ পরিবারকে এলাকার রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবার হিসেবে দেখা হয়। কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্না বলেছেন, জনপ্রিয় নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ পূর্ণমন্ত্রী হওয়ায় কক্সবাজারবাসী অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত, এবং তার হাতে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ জেলা ও দেশের জন্য বড় অর্জন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষ আরও বেশি পাবে। কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান জানান, জেলার জন্য এটি গৌরবের দিন, কারণ যোগ্য একজন মানুষকে মন্ত্রী হিসেবে পাওয়ায় কক্সবাজারের সার্বিক উন্নয়ন ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তাদের প্রত্যাশা













