শেখ হাসিনার চাচা শেখ কবিরকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন
ছবিঃ সংগৃহীত
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতাল স্কয়ারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শেখ কবির হোসেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর; বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় তিনি ভুগছিলেন বলে পরিবার ও ঘনিষ্ঠ মহল জানিয়েছে। রোববার বিকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অংশ হিসেবে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে শেষ বিদায় জানানো হয়।
রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তার মরদেহ ঢাকার হাসপাতাল থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিজ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়; স্বজনদের কান্নায় সেখানে শোকের আবহ নেমে আসে। বাদ জোহর তারই প্রতিষ্ঠিত টুঙ্গিপাড়া খান সাহেব শেখ মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে জানাজার আগে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় এবং পরে সেখানে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় টুঙ্গিপাড়া–কোটালীপাড়া আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এস এম জিলানী, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শরীফ রফিকউজ্জামান, তার ভাই শেখ নাদির হোসেন লিপু, স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ অংশ নিয়ে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
১৯৪২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ কবির হোসেন। তার বাবা খান সাহেব শেখ মোশাররফ হোসেন এবং মা রাহেলা খাতুন; পারিবারিকভাবে তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলের অংশ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার আপন চাচাত ভাই এবং সে সূত্রে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তিনি উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে সরকারি ও বেসরকারি—দুই অঙ্গনেই দীর্ঘ কর্মজীবন গড়ে তোলেন।
শেখ কবির হোসেন কর্মজীবন শুরু করেন সরকারি চাকরি দিয়ে; তিনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও সোনালী ব্যাংকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে তিনি বেসরকারি খাত ও সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করেন। দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বীমা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানবিক সেবামুখী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা ও সম্প্রসারণে তার অসামান্য ভূমিকা থাকায় তাকে ‘বীমা শিল্পের অন্যতম রূপকার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
২০১১ সালে তিনি বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং টানা প্রায় ১৩ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন, যা সংগঠনের ইতিহাসে দীর্ঘতম মেয়াদগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। স্বাস্থ্যের অবনতির কথা উল্লেখ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি এই পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বেসরকারি খাতে তিনি সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স ও ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেছেন; এর বাইরে বীমা ও আর্থিক খাতে তার প্রভাব উল্লেখযোগ্য ছিল।
শেখ কবির হোসেন ন্যাশনাল টি কোম্পানি, বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি বোর্ড বা পরিচালনা পর্যায়ে শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা খাতে অবদান রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ ও শহুরে অঞ্চলে শিক্ষা সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন।
মৃত্যুকালে শেখ কবির হোসেন স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন বলে তার পরিবারের বরাতে জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি পরিবারকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করতেন এবং টুঙ্গিপাড়ার স্থানীয় উন্নয়ন, অসচ্ছল মানুষের সহায়তা ও সামাজিক উদ্যোগে নিয়মিত অনুদান দিতেন বলে স্বজন ও সহযোগীরা জানিয়েছেন। তার মৃত্যুতে পরিবার, রাজনৈতিক অঙ্গন, বীমা শিল্প এবং শিক্ষা–স্বাস্থ্যখাতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে; গোপালগঞ্জ–টুঙ্গিপাড়ার নানা শ্রেণির মানুষ এটি একটি যুগঅবসানের সমতুল্য বলেই মন্তব্য করছেন।












