পরিত্যক্ত ড্রামের ভেতরে ২৬ টুকরার ছিন্নভিন্ন মরদেহ: বন্ধুকে খুনের আসামী করে মামলা
▪️ঢাকায় হাইকোর্ট–সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের পাশে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নীল রঙের ড্রামে মিলল টুকরো লাশের, জনমনে আতঙ্ক।
ঢাকার হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের গেটের কাছে দুটি নীল রঙের ড্রাম থেকে রংপুরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের ২৬ খণ্ডে বিভক্ত লাশ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় শুক্রবার শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন নিহতের বোন আনজিরা বেগম। মামলায় সরাসরি আসামি করা হয়েছে আশরাফুলের বন্ধু জরেজ মিয়াকে। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনের জড়িত থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খালিদ মনসুর জানান, তদন্ত চলছে এবং এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড ও ফরেনসিক তথ্য বিশ্লেষণ করে হত্যাকারী চক্রকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্থানীয়রা জাতীয় ঈদগাহ মাঠের গেটের কাছে দুটি ড্রামে তীব্র দুর্গন্ধ লক্ষ্য করেন এবং পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বস্তাগুলো খুলে একাধিক অংশে কাটা মানবদেহ উদ্ধার করে। তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলেও আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়, নিহত আশরাফুল হক। তিনি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর ১০ বছরের এক মেয়ে এবং সাত বছরের এক ছেলে রয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন দিন আগে আশরাফুল বন্ধু জরেজ মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ফোন দিলে জরেজই রিসিভ করতেন এবং নানা অজুহাত দেখাতেন। নিহতের বোন আনজিরা বেগম জানিয়েছেন, “জরেজই আমার ভাইকে ফোনে ধরত। বলত—ভাই ব্যস্ত, কালেকশনে গেছে। পরে আবার বলে মোবাইল নাকি ড্রেনে পাওয়া গেছে। সবই মিথ্যা ছিল।” আজ সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে লাশ গ্রহণের সময় আনজিরা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং দাবি করেন, “জরেজ মিয়া আমার ভাইকে খুন করেছে। আমি তার ফাঁসি চাই।”
নিহত আশরাফুলের স্ত্রী লাকী বেগমও জানান, বুধবার ও বৃহস্পতিবার তিনি স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু জরেজ ফোন ধরতেন এবং বলতেন যে আশরাফুল ‘কাজে ব্যস্ত’। পরিবারের কাছে জানিয়েছে, আশরাফুলকে হত্যার আগে তিনি একটি পাওনাদারের সঙ্গে টাকা আদায়ের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা আশরাফুলের মোবাইলেও কল করলে জরেজই ফোন ধরতেন।
পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছেন। ড্রাম থেকে উদ্ধার হওয়া দেহ খণ্ড, পোশাকের টুকরা, প্লাস্টিক, টেপ, মাটি ও রাসায়নিক নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। দেহ কাটা ও খণ্ডিত করার ধরন দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এটি পেশাদার কোনো ব্যক্তির পরিকল্পিত কাজ। ডিএনএ পরীক্ষা, আঙুলের ছাপ ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা মিলিয়ে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে হত্যার কারণ এবং আরও সংশ্লিষ্টদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
এলাকাবাসী জানান, কয়েক দিন ধরে তারা কিছু অপরিচিত ব্যক্তিকে ওই এলাকায় দেখেছেন। এই ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে এলাকায় উদ্বেগ বিরাজ করছে। পুলিশ আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে এবং কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তারা জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের ধরন, দেহ খণ্ডিত করার পদ্ধতি এবং প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে আসামিদের শনাক্ত করা হবে। পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা মামলাটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্ত করছেন এবং ডেটা ও পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ টাইমলাইন তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
পরিবার জানাচ্ছে, তিন দিন ধরে আশরাফুলের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় তারা খুব আতঙ্কিত ছিলেন। নিহতের ১০ বছরের মেয়ে ও সাত বছরের ছেলেকে স্বস্তি দিতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা। পরিবার এবং পুলিশ আশা করছেন, দ্রুত তদন্ত ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে। ঘটনায় পুরো এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে এবং বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।










