গণহত্যা-গৃহযুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষে জর্জরিত সুদানে দেড় লক্ষ প্রাণহানী: কেন এই সংঘাত?
এই ছবিতে, দক্ষিণ সুদানের মালাকাল শহরে যুদ্ধে নিহত এক বিদ্রোহী সৈনিকের মৃতদেহ হাত বাঁধা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। (এপি ছবি)
সংকটের উৎপত্তি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:
সুদানে বর্তমানে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ এবং মানবিক বিপর্যয় চলছে। এই সংকটের মূল উৎপত্তি ২০১৯ সালের মধ্যেই। তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ব্যাপক গণবিক্ষোভের পর সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর সামরিক ও বেসামরিক অংশগ্রহণে একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। তবে সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে।
২০২১ সালের অক্টোবর মাসে সেনাবাহিনী আবার অভ্যুত্থান ঘটায়। এই অভ্যুত্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন দুই সেনা নেতা — জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান (সেনাবাহিনীর প্রধান ও দেশটির প্রেসিডেন্ট) এবং জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো (আধা-সামরিক বাহিনী RSF-এর কমান্ডার, সাধারণভাবে হেমেডটি নামে পরিচিত)।

প্রাথমিকভাবে তারা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে উৎখাতের সময় জানজাওয়িদ মিলিশিয়া থেকেই গড়ে ওঠা দ্রুত সমর্থন বাহিনী (RSF) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। RSF-এর নেতা জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো (হেমেতি), যিনি পূর্বে প্রেসিডেন্ট আল-বশিরের অনুগত ছিলেন, পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হন এবং RSF-কে একটি শক্তিশালী আধা-সামরিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলেন।
যুদ্ধ শুধুমাত্র খার্তুম বা রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম দারফুর, কোর্ডোফান, পূর্ব সুদান এবং পোর্ট সুদান পর্যন্ত। সংঘর্ষে সোনার খনি, বন্দর এবং সীমান্ত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই বাহিনীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক শক্তি ও প্রতিবেশী দেশের সমর্থনও সংঘাতকে জটিল করে তুলেছে।
কেন সংকট এত ভয়াবহ? কারণের বিশ্লেষণ:
• দীর্ঘস্থায়ী ইতিহাস ও সামাজিক বিভাজন
সুদানের উত্তর আরব-মুসলিম অঞ্চল এবং দক্ষিণ/পশ্চিম/উপকূলীয় বিভিন্ন আফ্রিকান ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। পশ্চিম দারফুরের আগের সহিংসতা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কার্যক্রম নতুন সংঘাতকে আরও ভয়ঙ্কর করেছে।

ছবি- সংগৃহীত।
• সেনা-রাজনৈতিক কাঠামো ও ক্ষমতার বদল
RSF রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তার করেছে। সেনাবাহিনী এবং RSF-এর মধ্যে সৈন্য নিয়োগ, নেতৃত্ব এবং সম্পদ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়।
• রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক সংকট
সুদান যুদ্ধের আগে থেকেই দরিদ্র দেশ; রাষ্ট্রীয় আয় কম, সামাজিক সেবা সীমিত। যুদ্ধের ফলে কৃষি, খাদ্য উৎপাদন এবং স্বাস্থ্যসেবা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যা দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য নিরাপত্তার সংকট সৃষ্টি করেছে।
• মানবিক সঙ্কট ও নৃশংসতা
যুদ্ধ শুরু থেকে নৃশংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, যৌন নির্যাতন এবং গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে দারফুর অঞ্চলে। বহু মানুষ গৃহবন্দি বা গৃহচ্যুত হয়েছেন, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পরিস্থিতি ও মানবিক ফলাফল:
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সংঘর্ষে সুদানজুড়ে মারা গেছে দেড় লাখের বেশি মানুষ। প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। পোর্ট সুদান, খার্তুম এবং দারফুরের শহরগুলো ধ্বংসপ্রায়। খাদ্য ঘাটতি ও দুর্ভিক্ষে মানুষ বিপন্ন। শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে আছে; ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এবং শিশুদের প্রতি সহিংসতা রেকর্ড করা হয়েছে।
দারফুর অঞ্চলে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর উপর গণহত্যা ও জাতিগত নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। সেনাবাহিনী এবং RSF উভয়ই ব্যাপক যুদ্ধাপরাধে জড়িত বলে জাতিসংঘের তদন্তে উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে লাখ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়েছে, স্থানান্তরিত হয়েছে এবং তাদের সামাজিক জীবন বিপন্ন।

ছবি- সংগৃহীত।
আগামী সম্ভাব্য দৃশ্য ও ঝুঁকি:
যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, সুদান আবারও বিভক্ত হতে পারে, যেমন ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান আলাদা দেশ হিসেবে গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক সমাধান কঠিন, কারণ উভয় পক্ষের মধ্যে আনুগত্য, নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার বিষয় জটিলভাবে সংযুক্ত। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তির হস্তক্ষেপ সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দেশের উত্তর ও পূর্ব অঞ্চল সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, পশ্চিম দারফুর ও এল-ফাশে RSF-এর নিয়ন্ত্রণে। সংঘাতের কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন কমে গেছে; জনসংখ্যার বড় অংশ দরিদ্রতা, খাদ্য ঘাটতি এবং অসুরক্ষার মধ্যে জীবনযাপন করছে।













