ভারত কি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে? –কী বলছে চুক্তি
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে—সংঘাতের সময় সহিংসতা উসকে দেওয়া, হত্যাকাণ্ডে নির্দেশ দেওয়া এবং দমন-পীড়নের মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা—এই তিন অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত। রায়ের সময়ে তিনি ভারতে অবস্থান করায় বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর দাবি জানিয়ে নয়াদিল্লিতে আরও একটি চিঠি পাঠানো হবে। তবে ভারত তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করবে কি না—সেটি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, বিচারিক রায়ে দণ্ডনীয় অপরাধে অভিযুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অপর দেশে ফিরিয়ে দিতে পারে যে কোনো পক্ষ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়ে ভারতে নোট ভার্বাল পাঠিয়েছিল, যা ভারত গ্রহণ করলেও তখন কোনো মন্তব্য করেনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল—চিঠিটির বৈধতা এবং প্রক্রিয়াগত দিক আগে বিশ্লেষণ করা হবে, কারণ কোনো অন্তর্বর্তী সরকারের পাঠানো রাজনৈতিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
২০২৫ সালের অক্টোবরেও দিল্লি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিস্রী জানান—এটি সম্পূর্ণ বিচারিক ও আইনি বিষয়, এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, “আমরা প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনা করছি এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গেও কাজ করতে প্রস্তুত।”
ভারত কি বাধ্য হাসিনাকে ফেরাতে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যর্পণ চুক্তির কয়েকটি ধারাই ভারতকে বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া থেকে অব্যাহতি দিতে পারে। অধ্যাপক অনিন্দ্যজ্যোতি মজুমদার এবং অধ্যাপক ইমনকল্যাণ লাহিড়ী দু’জনেই বলেন—চুক্তিতে এমন শর্ত আছে, যা প্রয়োজনে ব্যবহার করে ভারত প্রত্যর্পণ এড়িয়ে যেতে পারে।
অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরীর মতে, রায় ঘোষণার পর বাংলাদেশে হাসিনার জীবন সংকটের ঝুঁকি তৈরি হলে ভারত চুক্তির মানবাধিকার সংক্রান্ত বিধান কাজে লাগিয়ে তাকে ফিরিয়ে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী অরিন্দম দাসও মনে করেন, হাসিনা দেশে না থাকায় উচ্চ আদালতে যাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হলে তা তাঁর মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হবে। পাশাপাশি তিনি বলেন—কোনো দেশে যদি কারও প্রাণহানি বা নিপীড়নের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ভিত্তিতে সেই ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিক
২০১৩ সালে দুই দেশের সরকার প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। তাতে বলা হয়—উভয় দেশে শাস্তিযোগ্য অপরাধে দণ্ডনীয় হলে এবং যার সাজা ন্যূনতম এক বছর হতে পারে, সেই ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করা যাবে। ২০১৬ সালে সংশোধিত চুক্তিতে আরও সহজ করা হয় প্রক্রিয়াটি—গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেই প্রত্যর্পণ চাওয়া সম্ভব হবে।
তবে একই চুক্তিতে উল্লেখ আছে—অপরাধ যদি “রাজনৈতিক চরিত্র” ধারণ করে, তাহলে প্রত্যর্পণ করার প্রয়োজন নেই। যদিও হত্যা ও নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ রাজনৈতিক অপরাধের তালিকায় পড়ে না, তবুও “বিচারের নেপথ্যে সৎ উদ্দেশ্য রয়েছে কি না”—এই ধারাটি ভারত চাইলে ব্যবহার করতে পারে।
কেন হয়েছিল এই চুক্তি?
সীমান্ত এলাকায় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর তৎপরতা, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া উত্তর–পূর্বের সন্ত্রাসী, এবং ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জেএমবি কার্যকলাপ বাড়ায় দুই দেশ সম্মিলিতভাবে চুক্তিটি করে। মূল লক্ষ্য ছিল—সীমান্ত পেরিয়ে অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান এবং পরে ভারতে আশ্রয় নেন। সেই থেকে তিনি দিল্লিতেই অবস্থান করছেন। ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর বাংলাদেশ তাকে ফিরিয়ে আনার নতুন প্রচেষ্টা শুরু করলেও ভারত এখনো কোনো প্রকার প্রত্যর্পণের ইঙ্গিত দেয়নি। বরং দিল্লি সংকেত দিচ্ছে—এটি আইনি পর্যালোচনার বিষয়, এবং মানবিক সুরক্ষা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগবে।










