ভয়াবহ তাপপ্রবাহে ইউরোপে মৃত্যু ৩৫ হাজার ছাড়িয়েছে, মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনা নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ইউরোপে এ বছরের ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, দাবানল ও খরার ধাক্কায় অন্তত ৩৫ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব সামনে আসার পর জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন বুধবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে তাঁর বার্ষিক ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে একটি নতুন ইউরোপীয় হিটওয়েভ প্ল্যান এবং ভবিষ্যতে আলাদা ইউরোপীয় অগ্নিনির্বাপক বিমান বহর গঠনের প্রস্তাব দেন।
ফন ডার লেয়েনের ভাষায়, ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ইউরোপের জন্য ছিল ‘সত্য যাচাইয়ের গ্রীষ্ম’। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাপপ্রবাহে ৩৫ হাজারের বেশি অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানির স্তর নেমে যাওয়া, হাসপাতাল ও বৃদ্ধনিবাসে অতিরিক্ত গরমের চাপ এবং ব্যাপক দাবানল পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলেছে।
তবে এই ৩৫ হাজারের হিসাবকে চূড়ান্ত মৃত্যুসংখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আগস্টের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো অনেক দেশের হাতে আসেনি। এর আগে প্রকাশিত বিভিন্ন দেশের প্রাথমিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ইউরোপে অন্তত ৩৫ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গিয়েছিল – যেখানে জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনেই ২৫ হাজারের বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব ছিল। তথ্য পূর্ণাঙ্গ হলে সংখ্যাটি আরও বাড়তে পারে।
স্পেনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। কার্লোস তৃতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মৃত্যুহার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার হিসাবে মে মাস থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাপের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ৪,৯৪৭টি মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যায়। এই সংখ্যা ২০২২ সালের আগের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যায়।
জার্মানিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল। দেশটির রবার্ট কখ ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে তাপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। শুধু ২২ থেকে ২৮ জুনের এক সপ্তাহেই আনুমানিক ৯,৬০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে।
এদিকে তাপপ্রবাহের পাশাপাশি ইউরোপজুড়ে দাবানলও বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। ফ্রান্স ও স্পেনের বিভিন্ন এলাকায় আগুনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। একই সময়ে দানিউব, রাইন ও গারোনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীতে পানির স্তর কমে যাওয়ায় কৃষি, নৌপরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নতুন ইউরোপীয় হিটওয়েভ প্ল্যানের পাশাপাশি ফন ডার লেয়েন ভবিষ্যতে ইইউর নিজস্ব অগ্নিনির্বাপক বিমান সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেছেন। বর্তমানে ইইউ সীমিত নিজস্ব বিমান বহরের পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোর বিমান, পানিবাহী যান ও জরুরি কর্মীদের সমন্বয় করে দাবানল মোকাবিলা করে। নতুন পরিকল্পনার লক্ষ্য হবে বড় আকারের জলবায়ুজনিত দুর্যোগে দ্রুততর ও সমন্বিত ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, এবারের গ্রীষ্মকে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতির একটি পূর্বাভাস হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরোপ বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের গবেষণাতেও বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ছাড়া এবারের গ্রীষ্মে দেখা চরম তাপ ও আর্দ্রতার মাত্রা সম্ভব হতো না।
এরই মধ্যে ইউরোপের ৩০টিরও বেশি পরিবেশ, কৃষি, পানি ও নাগরিক সংগঠন ইইউকে জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে ‘প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান’কে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, বন, জলাভূমি, মাটির পানি ধরে রাখার সক্ষমতা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা তাপপ্রবাহ, খরা ও বন্যার প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
২০২৬ সালের গ্রীষ্ম তাই ইউরোপের জন্য শুধু তাপমাত্রার নতুন রেকর্ডের গল্প নয়। ক্রমবর্ধমান তাপ, দাবানল, পানির সংকট ও অতিরিক্ত মৃত্যুর পর জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি এখন ইউরোপীয় নীতিনির্ধারণের অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।









