পর্তুগালে দারিদ্র্যতা কমলেও বৈষম্য রয়ে গেছে
পর্তুগালে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার কমলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে। “পর্তুগাল, সামাজিক ভারসাম্য ২০২৫” শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, গত দুই বছরে দেশটিতে দারিদ্র্যের ঝুঁকি কমে ১৫.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে একই সময়ে বহু মানুষ এখনো চরম বস্তুগত ও সামাজিক বঞ্চনার মধ্যে জীবনযাপন করছে।
দেশটির উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান “নোভা স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকস” (নোভা এসবিই)-এর গবেষকদের প্রস্তুত করা এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে যেখানে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের হার ছিল ১৭ শতাংশ, তা ২০২৫ সালে কমে ১৫.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও সমাজের বিভিন্ন স্তরে এখনো গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয়ের পর দেশটির গড় ব্যয়যোগ্য আয় ২০১৪ সালের ৯ হাজার ৮৫৬ ইউরো থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১৪ হাজার ৯৫১ ইউরোতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক দশকে জনগণের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ২৫.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে কম আয়ের মানুষের মধ্যেই আয়ের তুলনামূলক বৃদ্ধি বেশি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই উন্নতির পরও বেকার জনগোষ্ঠী, একক অভিভাবক পরিবার এবং স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মধ্যে দারিদ্র্যের হার এখনো অনেক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, বেকারদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৪২.৬ শতাংশ, একক অভিভাবক পরিবারের মধ্যে ৩৫.১ শতাংশ।
শিশুদের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে প্রায় ৩ লাখ ১ হাজার শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ৫ লাখ ৪১ হাজার মানুষও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষ দরিদ্রতম ১০ শতাংশের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি আয় করে। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ২৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর হাতে দেশের মোট আয়ের ৪৬.৫ শতাংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে।
দরিদ্র শিশুদের প্রায় ৩০ শতাংশ সামাজিক ও বস্তুগত বঞ্চনার মধ্যে বেড়ে উঠছে। তাদের অনেকেই নিয়মিত শিক্ষাবহির্ভূত কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে না এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু অতিরিক্ত জনাকীর্ণ বাসস্থানে বসবাস করছে।
প্রতিবেদনটি সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাবও তুলে ধরেছে। গবেষকদের মতে, সরকারি সামাজিক সহায়তা না থাকলে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪০.৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারত। “সামাজিক অন্তর্ভুক্তি আয়” কর্মসূচির আওতায় ২০২৫ সালে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার মানুষ সুবিধা পাবেন, যাদের উল্লেখযোগ্য অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
আঞ্চলিক বৈষম্যের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। আলেন্তেজো অঞ্চলে দেশের সর্বোচ্চ দারিদ্র্যের হার ১৭.৯ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। বিপরীতে বৃহত্তর লিসবনে এই হার সর্বনিম্ন, ১২.২ শতাংশ। এছাড়া আজোরস ও মাদেইরা অঞ্চলে বস্তুগত ও সামাজিক বঞ্চনার মাত্রা তুলনামূলক বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবায়ও বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে দন্ত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পেলেও তা সময়মতো বা পর্যাপ্ত ছিল না।
কর্মসংস্থানের বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে। গবেষণা অনুযায়ী, একজন পুরুষ প্রতি এক ইউরো আয় করলে সমপর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা একজন নারী গড়ে ৫৭ থেকে ৭২ সেন্ট পর্যন্ত আয় করেন।
গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক দুর্বলতা মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক মনোভাবেও প্রভাব ফেলছে। আর্থিক সংকটে থাকা মানুষদের মধ্যে রাষ্ট্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা বেশি এবং তারা দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হতাশাবাদী।












