পর্তুগালের পোর্তোতে নাগরিকত্ব আবেদনের চরম চাপ
পোর্তো রেজিস্ট্রি সার্ভিসের সেন্ট্রাল আর্কাইভের পরিচালক ইসাবেল আলমেইডা জানান, তাদের দপ্তরে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি ইমেল আসে, যেগুলোর বেশির ভাগই জাতীয়তার আবেদনের অবস্থা জানতে চেয়ে পাঠানো প্রশ্ন। তাঁর ভাষায়, “আমরা যদি সবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করি, তাহলে আবেদনপত্র প্রক্রিয়া করার জন্য যথেষ্ট কর্মী পাওয়া যাবে না।” তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই একবার উত্তর দেওয়ার পরও একই ব্যক্তি আবার এক–দুই সপ্তাহ বা এক–দু মাস পর নতুন করে ‘কেসের স্ট্যাটাস’ জানতে ইমেল পাঠান, ফলে চাপ আরও বাড়ে।
ইসাবেল আলমেইডা বার অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত অভিবাসন–সংক্রান্ত এক আলোচনায় বলেন, পোর্তো সেন্ট্রাল আর্কাইভে কাজের চাপ বর্তমানে তাদের সামর্থ্যের তুলনায় “অনেক বেশি”। তাঁর মতে, জনপ্রশাসনে দীর্ঘদিনের জনবল সংকটের কারণে, “আমরা যদি একেবারে না ঘুমিয়ে ২৪ ঘণ্টা সেখানে কাজও করতাম, তবু সব কেস সামলানো সম্ভব হতো না।”
১ লাখ ৪০ হাজার মুলতবি ফাইল, কর্মী মাত্র ১৭ জন
পোর্তো সেন্ট্রাল আর্কাইভের জনবল সংকট নতুন কিছু নয়; সরকারি নিবন্ধন ক্ষেত্রের কর্মীদের সংগঠন SINTAP–এর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে জাতীয়তা সংক্রান্ত প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মামলা (প্রসেসো) মুলতবি আছে। দুই বছরের মধ্যে মুলতবি ফাইলের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে; আগে যেখানে প্রায় ৭০ হাজার ফাইল ছিল, এখন তা ১ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে।
একই সময়ে অনুমোদিত জনবলের বিপরীতে কর্মীর সংখ্যা কমতে কমতে এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৭ জনে, যেখানে স্টাফ তালিকায় ছিল ৬৬টি পদ। এর ফলে প্রতি একজন কনজারভাদর বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ওপর প্রায় ১৭ হাজার ৫০০টিরও বেশি ফাইলের চাপ পড়ছে—যা বাস্তবে সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব বলে উল্লেখ করেছে শ্রমিক সংগঠনটি।
এত উচ্চমাত্রার চাপ ও দীর্ঘসূত্রতার প্রেক্ষাপটে সরকার পর্তুগিজ নাগরিকত্ব আইনে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। নতুন আইন অনুমোদিত হলে, স্বাভাবিক আবাসনের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পেতে হলে এখনকার তুলনায় আরও দীর্ঘ সময় বসবাসের প্রমাণ দেখাতে হবে।
পরিকল্পিত সংশোধনী অনুযায়ী পর্তুগিজ ভাষাভাষী দেশসমূহের নাগরিক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশের নাগরিকদের জন্য বৈধ আবাসিক পারমিটের ভিত্তিতে কমপক্ষে ৭ বছরের বসবাসের প্রমাণ লাগবে। অন্য সব দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে ১০ বছরের বৈধ বসবাস।
আগে অনেক ক্ষেত্রে প্রাক আবাসিক সময় বা প্রক্রিয়াজনিত অপেক্ষার সময়কে আংশিকভাবে গণনা করা হলেও, নতুন কাঠামোয় মূলত প্রথম রেসিডেন্স টাইটেল (আবাসিক পারমিট) ইস্যুর তারিখ থেকেই হিসাব শুরু হবে বলে খসড়া বিশ্লেষণে উল্লেখ আছে।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, আবাসিক মেয়াদ বাড়ানোর অন্যতম লক্ষ্য হলো আবেদনের প্রবাহ (ফ্লো) কমানো এবং প্রকৃতভাবে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসকারী ও সমন্বিত অভিবাসীদের অগ্রাধিকার দেওয়া। সমালোচকদের মতে, এতে প্রথম প্রজন্মের অনেক অভিবাসীর নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ আরও দীর্ঘ ও জটিল হবে, তবে সরকার যুক্তি দিচ্ছে অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার সঙ্গে ভারসাম্য রাখার জন্য এটি প্রয়োজনীয়।
নাগরিকত্ব আবেদনের স্রোত, জনবল সংকট ও আইন পরিবর্তনের চাপ সব মিলিয়ে পোর্তোর সেন্ট্রাল আর্কাইভ এক ধরনের ‘ব্রেকিং পয়েন্ট’-এ পৌঁছেছে বলে কর্মীদের সংগঠন (এস আই এন টি এ পি) সতর্ক করেছে। সংগঠনটির ভাষায়, যথাযথ নিয়োগ ও বিনিয়োগ ছাড়া শুধুমাত্র আইনি পরিবর্তন দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না, কারণ দেশে অন্য রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতেও (যেমন লিসবন) কয়েক লাখ ফাইল মুলতবি আছে।
অন্যদিকে ইসাবেল আলমেইডা নিশ্চিত করেছেন যে, সীমিত জনবল দিয়েই তাদের টিম যত দ্রুত ও পেশাদারভাবে সম্ভব ফাইল প্রক্রিয়াকরণে কাজ করছে। তিনি অভিবাসী ও আবেদনকারীদের উদ্দেশে পরামর্শ দেন, স্ট্যাটাস জানতে ইমেল পাঠানোর আগে অনলাইনে দেওয়া ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করতে এবং একই তথ্যের জন্য বারবার ইমেল না পাঠাতে, যাতে কাজের গতি কিছুটা হলেও বাড়ানো যায়।













