বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের কাতারে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী
অধ্যাপক ড. মাঈন উদ্দিন খন্দকারের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
বিশ্ববিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের যে ক’জন বিজ্ঞানী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অধ্যাপক ড. মাঈন উদ্দিন খন্দকার। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ার সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও বিকিরণ প্রযুক্তি গ্রুপের প্রধান। টানা পাঁচ বছর (২০২১–২০২৫) Stanford University ও Elsevier যৌথভাবে প্রকাশিত বিশ্বের শীর্ষ ২% গবেষকের তালিকায় স্থান পাওয়া এই বিজ্ঞানী আজ বাংলাদেশের গর্ব। সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে তাঁর সঙ্গে বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন সাংবাদিক আহমাদুল কবির। সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো
প্রশ্ন: আপনার বিজ্ঞানযাত্রার শুরুটা কীভাবে?
ড. মাঈন উদ্দিন খন্দকার: বিজ্ঞানী কেউ আকাশ থেকে নেমে আসেন না; কৌতূহল, অধ্যবসায় আর ব্যর্থতাকে জয় করার মানসিকতাই একজন মানুষকে বিজ্ঞানী করে তোলে। আমার শুরুটা বাংলাদেশের এক সাধারণ পরিবেশ থেকে। পড়াশোনার ভিত গড়ে ওঠে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। বিএসসি ও এমএসসি—উভয় পর্যায়েই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে আমি নিজেকে বড় পরিসরের জন্য প্রস্তুত করি।

প্রশ্ন: উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার আন্তর্জাতিক পথচলা কীভাবে শুরু হয়?
ড. খন্দকার: উচ্চশিক্ষার জন্য আমি দক্ষিণ কোরিয়ার Kyungpook National University-তে যাই। সেখানে পারমাণবিক ও বিকিরণ পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি সম্পন্ন করি। গবেষণার পথে অসংখ্য ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছি। ল্যাবে দিনের পর দিন কাজ করেও ফলাফল শূন্য এসেছে। কিন্তু প্রতিটি ব্যর্থ পরীক্ষাই আমাকে সঠিক উত্তরের দিকে এগিয়ে নিয়েছে।
পরবর্তীতে University of Malaya, International Atomic Energy Agency এবং RIKEN-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও শিক্ষকতার সুযোগ পাই। এখন পর্যন্ত আমার ৮০০-র বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে এবং ২৪ হাজারেরও বেশি সাইটেশন রয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রগুলো কী?
ড. খন্দকার: আমার গবেষণার মূল ক্ষেত্র পারমাণবিক বিজ্ঞান, বিকিরণ প্রযুক্তি, ন্যানোটেকনোলজি এবং পরিবেশগত তেজস্ক্রিয়তা। ক্যানসার চিকিৎসায় ‘ন্যানোপার্টিকেল রেডিওসেনসিটাইজেশন’ প্রযুক্তি নিয়ে আমার কাজ বিশেষভাবে আলোচিত। এই পদ্ধতিতে টিউমার কোষে ন্যানোপার্টিকেল প্রয়োগ করে কম বিকিরণ ডোজে বেশি কার্যকারিতা অর্জন সম্ভব, ফলে সুস্থ কোষের ক্ষতি কম হয়।
এছাড়া ‘থেরানোস্টিকস’ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছি, যেখানে একই সঙ্গে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সম্পন্ন করা যায়। পরিবেশ সুরক্ষায় খাদ্য ও পানিতে ভারী ধাতু শনাক্তকরণ, বিকিরণ দিয়ে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনা এবং সীসামুক্ত বিকিরণ সুরক্ষা সামগ্রী উন্নয়নও আমার গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিজ্ঞান কেবল তত্ত্বে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না—মানুষের জীবন নিরাপদ ও সুস্থ করাই গবেষণার চূড়ান্ত লক্ষ্য।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের উন্নয়নে বিজ্ঞানচর্চার ভূমিকা আপনি কীভাবে দেখেন?
ড. খন্দকার: সস্তা শ্রমের অর্থনীতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব নয়। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। মালয়েশিয়ার উদাহরণ নিলে দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগ এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ একটি দেশকে দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ২০–৩০ বছরের সুস্পষ্ট বিজ্ঞান নীতি প্রয়োজন।
প্রশ্ন: নবীন গবেষকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
ড. খন্দকার: গবেষণাকে কেবল ডিগ্রি নয়, জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। মৌলিক জ্ঞানের ভিত্তি মজবুত করতে হবে, আন্তর্জাতিক জার্নাল পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, দক্ষ মেন্টরের অধীনে কাজ করতে হবে এবং গবেষণায় সততা বজায় রাখতে হবে। গবেষণায় কোনো শর্টকাট নেই। ধৈর্য, ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মানসিকতা এবং আন্তর্জাতিক মানসিকতা থাকতে হবে।
প্রশ্ন: দেশের জন্য আপনার স্বপ্ন কী?
ড. খন্দকার: প্রবাসে কাজ করলেও আমার হৃদয় পড়ে আছে বাংলাদেশে। আমি দেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে আধুনিক ল্যাব, বৈশ্বিক সংযোগ এবং শিল্প-একাডেমিয়া সমন্বয়ের মাধ্যমে গবেষণা এগিয়ে নেওয়া হবে। বাংলাদেশের তরুণদের মেধা বিশ্বমানের—প্রয়োজন শুধু সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনা। আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনে বাংলাদেশ থেকেই বিশ্ব কাঁপানো বিজ্ঞানী বেরিয়ে আসবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকেই তিনি একটি সত্যিকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখেন। তাঁর বিশ্বাস—প্রতিদিনের ছোট কৌতূহলই একদিন বড় আবিষ্কারে রূপ নেয়।











