সুইজারল্যান্ড
২,০০০ অন্তর্বাস পুঁতে রাখা হয়েছিলো মাটির নিচে, কেন?
এক হাজার মানুষ, প্রায় এক হাজার জায়গায় মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিলেন ২ হাজার তুলার অন্তর্বাস। প্রথম শুনলে ঘটনাটি নিছক কৌতুকের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু এর পেছনে ছিল মাটির স্বাস্থ্য বোঝার একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা।
পরীক্ষাটি হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আগ্রোস্কোপের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই নাগরিক বিজ্ঞান প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল- মাটির ভেতরে থাকা অণুজীব ও অন্যান্য জীব কতটা সক্রিয়, তার একটি সহজ ও চোখে দেখা যায় এমন ধারণা পাওয়া। গবেষণাটির ফল ২০২৬ সালে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী প্লানেটস, পিপল, প্লানেট -এ প্রকাশিত হয়েছে।
পরীক্ষার পদ্ধতিটিও ছিল বেশ অদ্ভুত। গবেষকেরা একই ধরনের জৈব তুলার অন্তর্বাস বিভিন্ন জায়গায় মাটির নিচে পুঁতে দেন। সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল ১২ হাজার চায়ের ব্যাগ। প্রায় দুই মাস পর সেগুলো আবার মাটি খুঁড়ে বের করা হয়। এরপর দেখা হয়, অন্তর্বাসের কতটা অংশ মাটির জীবাণু ও অন্যান্য জীব ভেঙে ফেলেছে।
এখানেই অন্তর্বাসটি হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘মাপযন্ত্র’।
মাটির নিচে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, কেঁচোসহ নানা জীব জৈব পদার্থ ভাঙার কাজ করে। এই জীবগুলো যত বেশি সক্রিয়, তুলার অন্তর্বাসও সাধারণত তত দ্রুত ক্ষয়ে যায়। ফলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর অন্তর্বাসের কতটা অংশ নষ্ট হয়েছে, তা দেখে গবেষকেরা মাটির জৈবিক কার্যকলাপ সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন।
পরীক্ষায় দেখা যায়, সব জায়গার মাটি একরকম আচরণ করেনি।
ব্যক্তিগত বাগানের মাটিতে অন্তর্বাস তুলনামূলক দ্রুত পচেছে। কৃষিজমি ও ঘাসের জমিতে ছিল মাঝামাঝি মাত্রার ক্ষয়। অন্যদিকে লনে অন্তর্বাসের ক্ষয় ছিল সবচেয়ে কম। গবেষকেরা মনে করেন, মাটির জৈব পদার্থ, পুষ্টি, গঠন এবং সেখানে বসবাসকারী জীবের সক্রিয়তার পার্থক্যের সঙ্গে এই ফলের সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। অন্তর্বাস দ্রুত পচেছে মানেই সেই মাটি সব দিক থেকে ‘ভালো’- এমন নয়। গবেষণার প্রধান গবেষক ফ্রানৎস বেন্ডার সতর্ক করেছেন, কিছু পরিবেশে অতিরিক্ত দ্রুত পচনও মাটির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। অর্থাৎ শুধু অন্তর্বাস কত দ্রুত নষ্ট হয়েছে, সেটিকে মাটির সামগ্রিক স্বাস্থ্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে দেখা যাবে না।
গবেষকেরা এই পদ্ধতির জন্য একটি মজার নামও প্রস্তাব করেছেন- ‘আন্ডারপ্যান্টস ইনডেক্স’ বা ‘অন্তর্বাস সূচক’। উদ্দেশ্য শুধু বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ নয়; সাধারণ মানুষকে মাটির গুরুত্বের কথাও বোঝানো। কারণ মাটি আমাদের খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তি, পানি ও কার্বন ধরে রাখে এবং বিপুল জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল।
এই পরীক্ষার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এখানেই। মাটির স্বাস্থ্য নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার কথা শুনলে বিষয়টি অনেকের কাছে কঠিন ও দূরের মনে হতে পারে। কিন্তু মাটির নিচ থেকে দুই মাস পর একটি পুরোনো অন্তর্বাস তুলে ধরে তার ক্ষয়ের ছবি দেখানো গেলে- মাটির ভেতরে যে অসংখ্য জীব প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে, সেই অদৃশ্য পৃথিবীটাকে সহজেই চোখের সামনে আনা যায়।
অদ্ভুত দেখতে এই পরীক্ষাটি তাই শেষ পর্যন্ত অন্তর্বাস নিয়ে নয়। এর আসল গল্প মাটিকে নিয়ে- যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ বেঁচে আছে, অথচ যার ভেতরে প্রতিদিন ঘটে চলা বিশাল জীববৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।














