ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর মুখোমুখি ১১১ বাংলাদেশি, মিশর উপকূলে উদ্ধার
লিবিয়ার তবরুক উপকূল থেকে অনিয়মিত পথে গ্রিস যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে রাবারের নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন শতাধিক বাংলাদেশি। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নের ইউরোপযাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হয় জীবন-মৃত্যুর কঠিন লড়াইয়ে। প্রচণ্ড ঝড়, উত্তাল সাগর,নৌকায় পানি প্রবেশ ও ইঞ্জিন বিকল হয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পড়েন তারা।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর পৃথক তিনটি বিপদাপন্ন নৌযান থেকে মোট ১১১ জন বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজ। পরবর্তীতে তাদের মিশরের পোর্ট সাঈদ ও দামিয়াত বন্দরে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে তাদের মধ্যে ৫৮ জন পোর্ট সাঈদ এবং ৫৩ জন দামিয়াত নিরাপত্তা কেন্দ্রে রয়েছেন। মিশরে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের এক কর্মকর্তা সম্প্রতি দুই দিনব্যাপী পোর্ট সাঈদ ও দামিয়াত সফর করে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। তিনি তাদের সমুদ্রযাত্রা, বিপদের মুহূর্ত ও উদ্ধারের বিবরণ সংগ্রহ করেন। এ সময় ওই কর্মকর্তা নিজের ব্যক্তিগত মুঠোফোন থেকে প্রত্যেককে নিজ নিজ পরিবারে ফোন করে কথা বলার সুযোগ করে দেন।
ঝড়ের মধ্যে প্রহর গুণছিলেন মৃত্যুর
পোর্ট সাঈদে অবস্থানরত এক বাংলাদেশি প্রতিনিধিকে জানান, গত ১৪ সেপ্টেম্বর একটি রাবারের নৌকায় তারা গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু যাত্রার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়েন। উত্তাল সাগরে প্রায় এক দিন ও এক রাত ভেসে ছিল তাদের নৌকাটি। চারপাশে অন্ধকার আর বিশালাকার ঢেউয়ের মাঝে যেকোনো মুহূর্তে নৌকা ডুবে যাওয়ার আতঙ্কে ছিলেন তারা। শেষপর্যন্ত ‘KINGSTON’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজের কাছে তারা সাহায্যের আকুতি জানান। জাহাজটি মিশরের সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্রের মাধ্যমে তাদের উদ্ধার করে ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে পোর্ট সাঈদ বন্দরে নিয়ে আসে।
ইঞ্জিন বিকল ও নৌকায় ছিদ্র, নিখোঁজ ৩৯
পোর্ট সাঈদ নিরাপত্তা কেন্দ্রে থাকা অপর তিন বাংলাদেশি জানান, তারা বাংলাদেশি, মিশরীয় ও সুদানি নাগরিকসহ মোট ৫৬ জন একটি নৌকায় তবরুক থেকে রওনা হয়েছিলেন। সাগরে ঢোকার পরপরই ঝড়ের কবলে পড়ে তাদের নৌকাটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে নৌকায় ছিদ্র হয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। তাদের জরুরি বার্তা পেয়ে ‘MSC VIRGINIA’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ এগিয়ে আসে এবং ৩ বাংলাদেশিসহ মোট ১৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই নৌকায় থাকা অপর ৩৯ জন যাত্রী এখনও ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ রয়েছেন।
ডুবে যাওয়ার ১০ মিনিট আগে উদ্ধার
দামিয়াতে থাকা ৫৩ বাংলাদেশির অভিজ্ঞতা আরও শিউরে ওঠার মতো। তারা জানান, ১৪ সেপ্টেম্বর ৫৩ বাংলাদেশি ও ১৪ সুদানি নাগরিকসহ মোট ৬৭ জন একটি রাবারের নৌকায় যাত্রা করেন। সাগরে উত্তাল ঝড়ের মুখে পড়ে নৌকাটি যখন ডুবতে বসেছিল, ঠিক তখনই নেদারল্যান্ডসের Wagenborg Shipping-এর ‘IJBORG’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উদ্ধার পাওয়া বাংলাদেশিরা জানান, জাহাজটি পৌঁছাতে আর মাত্র ১০ মিনিট দেরি হলে তাদের কাউকেই হয়তো জীবিত পাওয়া যেত না।
নতুন জীবন ফিরে পেয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এসব অভিবাসী। দূতাবাস কর্মকর্তার সামনে ভয়াবহ সেই স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। গন্তব্য ছিল না মিশর, ফিরছেন দেশে
বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার হওয়া ১১১ জন বাংলাদেশির মূল লক্ষ্য মিশর ছিল না; তারা সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সামুদ্রিক দুর্যোগের মুখে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ ও উদ্ধারকারী দলের সহায়তায় তারা প্রাণে বেঁচে মিশরে এসে পৌঁছান।
তিনি আরও জানান, স্থানীয় পুলিশ, কারা কর্তৃপক্ষ, ন্যাশনাল সিকিউরিটি ও ইমিগ্রেশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের কনস্যুলার সেবা প্রদান করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) তাদের কায়রো থেকে ঢাকা ফেরার বিমানের টিকিট প্রদানে সম্মতি জানিয়েছে। ইতোমধ্যে যাদের কাছে পাসপোর্ট ছিল তাদের অনেকে দেশে ফিরে গেছেন। মিশরের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করে বাকিদের দ্রুত ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
স্বপ্নের ইউরোপ নাকি মৃত্যুফাঁদ?
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপ প্রবেশের এই চেষ্টা আবারও এক নির্মম বাস্তবতা সামনে এনেছে। ঝুঁকিপূর্ণ রাবারের নৌকা, বৈরী আবহাওয়া ও অদক্ষ চালকদের কারণে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের প্রাণহানি। মানবপাচারকারী চক্রের লোভনীয় প্রলোভনে পড়ে বাংলাদেশিদের এ ধরনের আত্মঘাতী যাত্রায় সামিল হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছে বাংলাদেশ দূতাবাস।













