চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে চলমান বিচারকাজে দিনের পর দিন অনুপস্থিত থাকায় চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) বর্তমান ও দেশের অন্যান্য ইউনিটে বদলি হওয়া প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। বিচারিক প্রক্রিয়ায় বারবার সমন জারি করার পরও তা উপেক্ষা করায় আদালত বাধ্য হয়ে এ ধরনের চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
চিঠিপত্র ও আদালত সূত্রে জানা যায়, সিএমপির উপকমিশনার (সদর) দপ্তর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ১৮টি পৃথক স্মারকে জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিগুলোতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের প্রধানদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা তাঁদের আওতাধীন অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের নির্ধারিত দিনে সকাল ৯টায় আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। অতীতে সমন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে জামিন অযোগ্য পরোয়ানা সত্ত্বেও তাঁরা আদালতে হাজির হননি। বিষয়টিকে বিচারকাজের দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো পুলিশ সদস্য ভবিষ্যতে আবারও অনুপস্থিত থাকলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫(ক) ধারা অনুসরণে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
যেসব সাক্ষীকে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে, তাঁদের পদমর্যাদা কনস্টেবল থেকে শুরু করে পরিদর্শক পর্যন্ত বিস্তৃত। অনেকে চট্টগ্রাম জেলা ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ দেশের নানা স্থানে কর্মরত আছেন। পাশাপাশি সিআইডি, পিবিআই, নৌ পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও বিশেষায়িত গোয়েন্দা সংস্থা এসবির সদস্যরাও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের অধিকাংশ পূর্বে সিএমপির পতেঙ্গা, কোতোয়ালি, খুলশী, সদরঘাট, হালিশহর, চকবাজার, কর্ণফুলী, ডবলমুরিং, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, আকবরশাহ, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ, পাহাড়তলী ও ইপিজেড থানায় দায়িত্বরত ছিলেন।
বিচারাধীন এসব মামলা বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন বিশেষ আদালত এবং শিশু আদালতে ঝুলন্ত অবস্থায় আছে।
গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ সালের একটি হত্যা মামলায় সিএমপি কমিশনারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আদেশ দেন অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ৩য় আদালত। আদালতে অভিযোগ গঠনের পর রাষ্ট্রপক্ষ বারবার চেষ্টা করেও সাক্ষীদের হাজির করতে ব্যর্থ হওয়ায় মামলার বিচারকাজ এগোচ্ছে না। আদেশে স্পষ্ট জানানো হয়, নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীকে উপস্থিত রাখতে না পারলে ১৭১(২) ধারা অনুযায়ী সম্ভাব্য আইনি জটিলতার সব দায়ভার পুলিশ কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তাবে।
আদালতসংশ্লিষ্টরা জানান, কর্মস্থল পরিবর্তন কিংবা বদলির পর সমন যথাযথ স্থানে পৌঁছাতে প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি হয়। এছাড়া অনেক সময় সমন পৌঁছালেও সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র মিলতে বিলম্ব হয়।
শুধু চট্টগ্রামই নয়, নোয়াখালী জেলাতেও পুলিশ সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। নোয়াখালী পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে ১২১ জন পুলিশ সদস্যকে আদালতে উপস্থিত থাকার কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো সদস্য যৌক্তিক কারণ দর্শানো ছাড়া অনুপস্থিত থাকলে বিভাগীয় আইনি শাস্তির আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে এবং এই প্রতিবেদন রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এর আগেও সিএমপির পক্ষ থেকে শত শত পুলিশ সাক্ষীকে আদালতে পাঠাতে চিঠি জারি করা হয়েছিল। তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে, অভিযুক্ত সাক্ষীদের একটি অংশ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় চট্টগ্রামে দায়িত্বরত ছিলেন। নানা প্রতিকূলতা ও নিরাপত্তার ভয়েও অনেকে আদালতে আসতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
আইনজীবীদের মতে, একজন দায়িত্বশীল পুলিশ সদস্যের অনুপস্থিতি বিচারপ্রার্থী ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। আইন বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা দূর করে সাক্ষীদের সুরক্ষা ও যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি আদালতের নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় জবাবদিহিতা বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।