মিরসরাইয়ে গলিত লোহা ছিটকে চীনা প্রকৌশলীসহ ৩ জনের মৃত্যু
ফার্নেসের ত্রুটিতে দগ্ধ ৪ জন, চিকিৎসাধীন আরেক শ্রমিক
চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের একটি স্টিল কারখানায় ফার্নেসের ত্রুটির কারণে গলিত লোহা ছিটকে দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় চীনা প্রকৌশলীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ফার্মিক স্টিল লিমিটেডের কারখানায় এ দুর্ঘটনায় চারজন দগ্ধ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে তিনজনের মৃত্যু হয়। আহত অপর শ্রমিক বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতরা হলেন চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং (৫৩), শ্রমিক শরিফুল ইসলাম (২৭) ও মনির হোসেন (২৭)। তাঁদের মধ্যে শরিফুল ইসলাম ও জেংলিং হং ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এবং মনির হোসেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
যেভাবে ঘটেছিল দুর্ঘটনা
কারখানা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে ফার্মিক স্টিল লিমিটেডের ফার্নেসে ত্রুটি দেখা দেয়। এ সময় চুল্লি থেকে গলিত লোহা ছিটকে পড়লে চারজন দগ্ধ হন। দুর্ঘটনার পর তাঁদের দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন জায়গায় বয়লার বিস্ফোরণের খবর ছড়িয়ে পড়লেও কারখানা কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে। তাদের দাবি, এটি বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা নয়। ফার্নেসে ত্রুটির কারণে চুল্লি থেকে গলিত লোহা ছিটকে পড়েই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
দগ্ধদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থার অবনতি হলে তাঁদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শরিফুল ইসলাম ও চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হংকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজনের মৃত্যু
দুর্ঘটনার তিন দিন পর, ১ অক্টোবর সকালে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শরিফুল ইসলাম মারা যান। একই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান মনির হোসেন।
এরপর সর্বশেষ ২ অক্টোবর বেলা ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি চীনা নাগরিকদের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা সুমন হোসেন নিশ্চিত করেন।
দুর্ঘটনায় দগ্ধ অপর শ্রমিক জুয়েল (৩৬) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর অবস্থা আশঙ্কামুক্ত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নিহত শ্রমিকের পরিবারের সঙ্গে ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলোচনা
নিহত শরিফুল ইসলামের পরিবারের সঙ্গে ক্ষতিপূরণ নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের আলোচনা হয়েছে। পরিবারকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হলেও এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। শনিবার সন্ধ্যায় জোরারগঞ্জ থানায় নিহতের স্বজন এবং কারখানার চীনা ও বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
শরিফুলের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁরা মামলা না করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চান। নিহত শরিফুলের দুটি ছোট সন্তান রয়েছে। তিনি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন।
আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে পুলিশের বক্তব্য
জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল হালিম জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় দগ্ধ চারজনের মধ্যে চীনা প্রকৌশলীসহ তিনজন মারা গেছেন। নিহতের পরিবার মামলা না করলেও পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
এদিকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও কারও দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না, তা নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ফার্নেসের ত্রুটি।
মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পকারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও শিল্পকারখানার কারিগরি ব্যবস্থাপনা নিয়ে এ দুর্ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দুর্ঘটনার পর আহত চারজনের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হওয়ায় বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।










