সোনার বাজার এত অস্থির কেনো?
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে সোনার দাম নজিরবিহীনভাবে ওঠানামা করছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে আউন্সপ্রতি দাম পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে অল্প সময়ের জন্য পাঁচ হাজার পাঁচশ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, আবার দ্রুত নেমে এসেছে চার হাজার আটশ ডলারের ঘরে। একই প্রবণতা দেখা গেছে রূপা ও প্লাটিনামের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে—একপর্যায়ে ভরিপ্রতি দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায়, পরে কয়েক দফায় কমে আসে। এই নাটকীয় অস্থিরতার পেছনে একাধিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ কাজ করছে।
সোনা ঐতিহ্যগতভাবে “নিরাপদ আশ্রয়” সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ যখন বিশ্ব অর্থনীতি বা রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ—যেমন শেয়ার—থেকে সরে গিয়ে সোনায় বিনিয়োগ বাড়ান। ইউক্রেন ও গাজায় যুদ্ধ, বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন, বাণিজ্য নীতি নিয়ে বিরোধ—এসব কারণ বাজারে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও সম্ভাব্য নতুন বাণিজ্য বাধা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা মূলধন সুরক্ষায় সোনার দিকে ঝুঁকছেন।
ডলারের মান এবং সুদের হার সোনার দামে বড় প্রভাব ফেলে। সাধারণভাবে ডলারের মান কমলে সোনার দাম বাড়ে, কারণ তখন অন্যান্য মুদ্রাধারীদের কাছে সোনা তুলনামূলক সস্তা হয় এবং চাহিদা বাড়ে। আবার সুদের হার কমার সম্ভাবনা তৈরি হলে সোনার আকর্ষণ বাড়ে, কারণ সোনা নিজে সুদ দেয় না—তাই উচ্চ সুদের পরিবেশে এটি তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব ও সুদনীতিকে ঘিরে জল্পনা তৈরি হওয়ায় বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করেছিলেন, রাজনৈতিক চাপের কারণে সুদের হার দ্রুত কমানো হতে পারে, যা ডলারের মান ও মুদ্রাস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। পরে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল নীতির ইঙ্গিত মিললে দাম কিছুটা নেমে আসে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ভূমিকা এই অস্থিরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহু দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সোনার অংশ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার কৌশল হিসেবে অনেক দেশ ডলারনির্ভর সম্পদের বদলে সোনা ধরে রাখতে আগ্রহী। বিশ্ব স্বর্ণ কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয়চাহিদা ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে ছিল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সেই গতি কিছুটা কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবুও সামগ্রিক চাহিদা এখনো শক্তিশালী।
চাহিদার আরেকটি বড় উৎস হলো চীন ও ভারতসহ এশিয়ার ভোক্তা বাজার, যেখানে সোনা গয়না ও বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই জনপ্রিয়। পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোতে এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) ও স্বর্ণভিত্তিক আর্থিক পণ্যের মাধ্যমে বিনিয়োগ বেড়েছে। এমনকি কিছু ডিজিটাল সম্পদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোনা কিনেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে, যা বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
সরবরাহের দিক থেকেও সোনা একটি সীমিত সম্পদ। ইতিহাসে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখের কিছু বেশি টন সোনা উত্তোলিত হয়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থার হিসাব। খনি থেকে নতুন সোনা উত্তোলনের গতি দ্রুত বাড়ানো যায় না; বড় খনি আবিষ্কার, অনুমোদন ও উৎপাদনে বহু বছর সময় লাগে। ফলে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেলে সরবরাহ তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ানো সম্ভব হয় না, এবং দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়।
অন্যদিকে বাজারে প্রত্যাশা ও মনস্তত্ত্বও বড় ভূমিকা রাখে। একটি সম্ভাব্য নীতিগত সিদ্ধান্ত, কোনো দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মন্তব্য—এসব খবর মুহূর্তেই বাজারে প্রভাব ফেলে। অনেক সময় বাস্তব পরিবর্তনের আগেই “সম্ভাবনা”র ভিত্তিতে বিনিয়োগকারীরা কেনাবেচা শুরু করেন। পরে পরিস্থিতি স্পষ্ট হলে বিপরীতমুখী লেনদেন শুরু হয়, ফলে দাম দ্রুত কমে যায়। সাম্প্রতিক পতনের ক্ষেত্রেও এমন প্রত্যাশা-ভিত্তিক লেনদেন বড় ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশের বাজার আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। বিশ্ববাজারে আউন্সপ্রতি দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে, তার সঙ্গে যুক্ত হয় ডলার বিনিময় হার ও স্থানীয় কর–শুল্ক। ফলে বিশ্ববাজারে বড় ওঠানামা দেশের বাজারেও প্রতিফলিত হয়। সাম্প্রতিক রেকর্ড বৃদ্ধির পর কয়েক দফায় ভরিপ্রতি দাম কমলেও, এক বছর আগের তুলনায় এখনো তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সব মিলিয়ে সোনার বাজারের অস্থিরতা একক কোনো কারণে নয়; বরং ভূরাজনীতি, মুদ্রানীতি, ডলারের গতিপ্রকৃতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশল, বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্ব এবং সীমিত সরবরাহ—এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব। বিশ্ব পরিস্থিতি যত বেশি অনিশ্চিত হবে, সোনার বাজারেও তত বেশি ওঠানামা দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।










