জঙ্গল সলিমপুর: বাংলাদেশের ভেতর এক ‘অঘোষিত নিষিদ্ধ রাষ্ট্র’
সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাব কর্মকর্তা নিহত, প্রশ্নের মুখে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর—প্রকৃতির কোলে ঘেরা এক শান্ত এলাকা হওয়ার কথা ছিল যার পরিচয়। অথচ চার দশকের বেশি সময় ধরে পাহাড় কাটা, অবৈধ দখলদারিত্ব ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দাপটে এলাকাটি আজ বাংলাদেশের মানচিত্রের ভেতরেই এক ‘অঘোষিত নিষিদ্ধ রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের যেকোনো উদ্যোগের জবাবে এখানে গড়ে তোলা হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ।
সোমবার সন্ধ্যায় সেই নিষিদ্ধ এলাকাতেই ফের ঝরল রক্ত। সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। আহত হন আরও অন্তত চারজন র্যাব সদস্য। এই হত্যাকাণ্ড আবারও নগর-সংলগ্ন বিশাল এক পাহাড়ি অঞ্চলে রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্বস্ত গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, জঙ্গল সলিমপুর ও পাশের আলীনগরের গহিন পাহাড়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার সন্ধ্যায় র্যাব-৭ এর একটি দল অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে নামে। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় ওঁত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা হঠাৎ র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, হামলাকারীরা শুধু ইট-পাটকেল বা লাঠিসোঁটা নয়, আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে চারজন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া মারা যান। র্যাবের সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এআরএম মোজাফফর হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই এলাকা আয়তনে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। প্রশাসনিকভাবে এটি সীতাকুণ্ডের অংশ হলেও ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এটি কার্যত নগরীর সীমানায় অবস্থিত।
পূর্বে হাটহাজারী, দক্ষিণে বায়েজিদ থানা—এই ত্রিভুজ এলাকায় গড়ে উঠেছে এক দুর্ভেদ্য পাহাড়ি দুর্গ, যেখানে আইনের শাসন কার্যত অনুপস্থিত।
গত ৪০ বছরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি। ‘ছিন্নমূল পুনর্বাসন’-এর আড়ালে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার প্লট বাণিজ্য। এই অবৈধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে স্থানীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা।
এ এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব। প্রতিটি প্রবেশপথে সশস্ত্র পাহারা, বাসিন্দাদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্র, বাইরের লোকের জন্য কার্যত নিষেধাজ্ঞা। এমনকি পুলিশ বা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও এখানে প্রবেশ করতে হয় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে।
জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান মানেই হামলা।
- ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ওসিসহ ২০ জন আহত হন ককটেল হামলায়।
- ২০২২ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে পরপর দুই দফা পুলিশের ওপর হামলা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকাটি দখলকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। পুরনো ও নতুন আধিপত্য বিস্তারকারী গ্রুপের মধ্যে একাধিক বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে, নিহতও হয়েছে মানুষ। পেশাগত দায়িত্ব পালনে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরাও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে জঙ্গল সলিমপুর এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। নগরে অপরাধ করে সন্ত্রাসীরা অনায়াসেই এখানে গা ঢাকা দেয়। দিনের আলোতে পাহাড় কাটা, রাতে সশস্ত্র মহড়া—সবই চলে প্রকাশ্যে।
বিদ্যুৎ ও পানির অবৈধ সংযোগ, বন বিভাগের নির্দেশ উপেক্ষা করে অবৈধ স্থাপনা—সব মিলিয়ে প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয় বলে অভিযোগ, যার অংশ পৌঁছে যায় উপরমহল পর্যন্ত। ফলে উচ্ছেদ অভিযান বারবার শুরু হলেও কখনোই স্থায়ী সমাধান আসে না।
র্যাব কর্মকর্তার মৃত্যু পরিস্থিতিকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা জরুরি বৈঠকে বসেছেন। জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে বড় ধরনের সম্মিলিত অভিযান চালানোর প্রস্তুতি চলছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, একটি সাময়িক অভিযান কি পারবে ৪০ বছরের এই সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য ভেঙে দিতে?
সাধারণ মানুষের দাবি স্পষ্ট, শুধু সন্ত্রাসীদের নয়, তাদের পেছনে থাকা রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী আশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে বারবার এই পাহাড়ে রক্ত ঝরবে, আর রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব হারাবে অস্ত্রধারী দস্যুদের কাছে।
নিহত ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়—জঙ্গল সলিমপুরকে স্থায়ীভাবে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনা এখন সময়ের দাবি।













