ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত প্রায় ৮০০ শিশু, বাস্তুচ্যুত সাড়ে ৩ লাখ
লেবাননে দীর্ঘদিন ধরে চলা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে প্রায় ৮০০ শিশু নিহত হয়েছে। একই সময়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশুকে। দেশটির এক আইনপ্রণেতা জানিয়েছেন, সংঘাতের কারণে শিশুদের শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি তাদের ওপর গভীর মানসিক ও সামাজিক প্রভাব পড়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়েও লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় শিশু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ জেলার কাপড় রুম্মান শহরে একটি বাড়িতে বিমান হামলায় দুই শিশু নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও চারজন। এছাড়া আরবসালিম শহর এবং নাবাতিয়েহ নগরীতে পৃথক হামলায় আরও তিন শিশু আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
লেবাননের কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২৬ জুন একটি কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হয়নি। চুক্তির আওতায় লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিনিময়ে ইসরায়েলি বাহিনীর ধাপে ধাপে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সরে যাওয়ার কথা ছিল।
রোববার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ইসরায়েলি হামলাকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, এসব হামলা যুদ্ধবিরতি ও কাঠামোগত চুক্তি লঙ্ঘনের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
প্রায় ৮০০ শিশু নিহত
লেবাননের পার্লামেন্টের নারী ও শিশু বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ইনায়া এজ্জেদ্দিন শনিবার বলেন, ২০২৪ ও ২০২৬ সালে ইসরায়েলের চালানো দুই দফা যুদ্ধে প্রায় ৮০০ শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
তার ভাষ্য, হামলায় বহু শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। তাদের কেউ কেউ একাধিক অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হয়েছে। অনেক শিশু হাত-পা কিংবা চোখ হারিয়েছে। এসব শিশুর শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক, আবেগীয় ও সামাজিক সহায়তার প্রয়োজন হবে।
ইনায়া এজ্জেদ্দিন জানান, ইসরায়েলি হামলার কারণে প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশু। আশ্রয় নেওয়া এলাকাতেও হামলার ঘটনা ঘটায় অনেক শিশুকে একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, বাড়িঘর ছেড়ে পালানোর সময়ও কিছু শিশু হামলার শিকার হয়েছে। সংঘাতের কারণে শিশুদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কেবল শারীরিক আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুতি এবং স্বজন হারানোর মতো অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউনিসেফের উদ্বেগ
লেবাননে সংঘাতের কারণে শিশুদের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফও উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি এর আগে সতর্ক করে বলেছিল, সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও মানসিক আঘাতের সবচেয়ে বড়ো বোঝা বহন করছে শিশুরা।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
লেবাননের কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৪ হাজার ৩৬২ জন নিহত এবং ১২ হাজার ৩৭৮ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এদিকে দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি এলাকায় এখনো ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে কিছু এলাকা দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, আবার কিছু অঞ্চল ২০২৩-২০২৪ সালের সংঘাতের সময় দখলে নেওয়া হয়। বর্তমান সামরিক অভিযানে ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ডের ১০ কিলোমিটারের বেশি ভেতরে প্রবেশ করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।










