নোয়াখালীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানায় বসেছিল রাজকীয় খানাপিনার আসর। যেখানে আইন অনুযায়ী কড়াকড়ি নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার কথা, সেখানে দুই প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার জন্য আয়োজন করা হয় বিশেষ বেয়াইখানা—বর ও কনের বাবার ভোজ।
পুলিশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সংরক্ষিত নারী হাজতখানায় এই আয়োজনের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড (বদলি) করা হয়েছে এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গত ৩০ ডিসেম্বর কারাগারে থাকা অবস্থায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আ জ ম পাশা চৌধুরীর মেয়ে ফালিহা আজমের সঙ্গে হাতিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছাইফ উদ্দিন আহমদের ছেলে ছাইম উদ্দিনের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বর ও কনের দুই পিতাই হত্যা, নাশকতাসহ একাধিক মামলায় কারাবন্দি।
গত সোমবার (১৯ জানুয়ারি) তাঁদের আদালতে হাজিরার দিন ধার্য ছিল। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পুলিশের যোগসাজশে আদালতের হাজতখানার ভেতর বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, দুই আওয়ামী লীগ নেতা রাজকীয় ভঙ্গিতে খাবার গ্রহণ করছেন এবং পরিবারের সদস্যরা তাঁদের খাবার পরিবেশন করছেন।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট পাঁচ পুলিশ সদস্যকে নোয়াখালীর দুর্গম হাতিয়া উপজেলার বিভিন্ন পুলিশ ফাঁড়িতে বদলি করা হয়েছে। বদলি হওয়া সদস্যরা হলেন—
- এটিএসআই জাহেদুল ইসলাম
- এটিএসআই কবির আহম্মদ ভূঁইয়া
- কনস্টেবল বিল্লাল হোসেন
- কনস্টেবল মো. হাসান
- কনস্টেবল সাইফুল ইসলাম
নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন জানান, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হতে পারে।
ঘটনার তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লিয়াকত আকবর ও পরিদর্শক মো. শাহ আলম। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুর রহমান বলেন, “এটি শুধু নিয়মভঙ্গ নয়, বরং আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি। যাচাই ছাড়া বাইরের খাবার ও পরিবারের সদস্যদের হাজতখানায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়া গুরুতর অপরাধ।”
সাধারণ মানুষের মাঝেও এ ঘটনায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
আ জ ম পাশা চৌধুরীর বিরুদ্ধে ছাত্রশিবিরের সাত কর্মীকে গুলি করে হত্যার মামলাসহ একাধিক সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ছাইফ উদ্দিন আহমদ হাতিয়া ও চরজব্বর থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাসহ অন্তত পাঁচটি মামলার আসামি।
৫ আগস্টের পর নিষিদ্ধ বা কার্যক্রম স্থগিত থাকা দলের নেতাদের এমন বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পেছনে পুলিশের ভেতরে আরও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।