বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়—২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার ৪৫৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করে। এই দীর্ঘ রায়ে রাষ্ট্রীয় মদদে পরিচালিত ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ও দমননীতির বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে।
গত ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে দুটি পৃথক অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।
মামলার অপর আসামি সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় তাকে বিশেষ বিবেচনায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্তদের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বিশ্লেষণ করে অপরাধগুলোকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করেছেন।
প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে উসকানি ও প্ররোচনা। রায়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ বলে আখ্যায়িত করেন। আদালতের মতে, এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত উসকানি।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনের রেকর্ড থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি আন্দোলন কঠোরভাবে দমনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই উসকানির সরাসরি ফল হিসেবে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে সরাসরি হত্যার নির্দেশ ও নৃশংসতা। রায়ের সবচেয়ে ভয়াবহ অংশটি ১৮ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত বলেন, তৎকালীন মেয়র ফজলে নূর তাপস ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে কথোপকথনে শেখ হাসিনা ড্রোনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত করে হেলিকপ্টার থেকে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন।
এই নির্দেশের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় ৫ আগস্ট ঢাকার চানখারপুল ও আশুলিয়ায়। চানখারপুলে ছয়জন এবং আশুলিয়ায় আরও ছয়জনকে গুলি করে হত্যার পর তাদের দেহে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব পাশবিক ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ে একটি নজিরবিহীন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তিদের নামে থাকা সব স্থাবর সম্পত্তি—জমি ও ভবন—এবং অস্থাবর সম্পত্তি—ব্যাংক ব্যালেন্স ও শেয়ার—রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই সম্পদ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার ও আহতদের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য সরকারকে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মাধ্যমে জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, ৪৫৭ পৃষ্ঠার এই রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।
রায় প্রকাশের পর জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বলেছেন, এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে—জনগণের ওপর গুলি চালিয়ে কেউ পার পায় না। তারা দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা।
শহীদ আবু সাঈদ থেকে শুরু করে আশুলিয়ায় পুড়িয়ে দেওয়া সেই দেহগুলো—সবার রক্তের যে ঋণ, ৪৫৭ পৃষ্ঠার এই রায়ে তার আংশিক বিচার প্রতিফলিত হয়েছে। বিচার বিভাগ তার দায়িত্ব পালন করেছে; এখন দেখার বিষয়, সরকার কত দ্রুত দণ্ড কার্যকর করে জুলাই বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারে।