ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়া একটি নৌকা থেকে উদ্ধারের মাত্র ১৭ দিনের মধ্যেই ৪৮ জন অনিয়মিত অভিবাসীকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে ইউরোপের দ্বীপ রাষ্ট্র মাল্টা। এত স্বল্প সময়ে অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হওয়াকে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ১২ ডিসেম্বর মাল্টার উপকূলে অভিবাসীবাহী একটি নৌকা ডুবে গেলে মাল্টার সশস্ত্র বাহিনী ৬১ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ৫৯ জন ছিলেন বাংলাদেশি এবং দুই জন মিশরের নাগরিক। ওই সময় দু’জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়।
উদ্ধারকৃতদের মধ্য থেকে প্রথমে চার জনকে মাল্টায় পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই ফেরত পাঠানো হয়। পরে ২৮ ডিসেম্বর রাতে বিশেষ ফ্লাইটে আরও ৪৪ জনকে মাল্টা থেকে পাঠানো হয়। বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ইমিগ্রেশন পুলিশ শাখা জানিয়েছে, ওই ফ্লাইটে করে মোট ৪৩ জন বাংলাদেশি পুরুষ ঢাকায় ফেরেন। ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় বিকাল ৫টা ২০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
মাল্টায় বাংলাদেশের অনাবাসিক দূতাবাস হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী গ্রিসের এথেন্সে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, এই ফেরত পাঠানোকে জোরপূর্বক ডিপোর্টেশন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বলেন, উদ্ধারকৃত অনেক বাংলাদেশির শরীর জ্বালানিতে পুড়ে গিয়েছিল এবং তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিলেন। চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই অবস্থায় সবাই স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং কেউ মাল্টায় থাকতে চাননি।
দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, এখনো কয়েকজন বাংলাদেশি মাল্টায় অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায়, তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তাকে ফেরত পাঠানো হয়নি। অন্যদের ক্ষেত্রে মাল্টার আশ্রয়নীতির আওতায় আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যারা দেশে ফিরেছেন, তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মাল্টা সরকার আর্থিক সহায়তাও দিয়েছে, যদিও সহায়তার পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
ইউরোপীয় ট্র্যাভেল অ্যান্ড আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম জানিয়েছে, সাধারণত ডিপোর্টেশন বা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে মাস বা বছর লেগে যায়। সেখানে মাল্টার এই দ্রুততা অস্বাভাবিক। মাল্টা সরকার জানিয়েছে, পুলিশ, স্বরাষ্ট্র, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের কারণেই দ্রুত প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাল্টায় প্রবেশ করা অনিয়মিত অভিবাসীদের ৮১ শতাংশকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। গত পাঁচ বছরে দেশটিতে অনিয়মিত অভিবাসীর আগমন কমেছে প্রায় ৯৩ শতাংশ। মাল্টার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, যারা শরণার্থী হিসেবে সুরক্ষার যোগ্য, সরকার তাদের সহায়তা দেয়, আর যারা অবৈধভাবে এসে ব্যবস্থার অপব্যবহার করে, তাদের ফেরত পাঠানো হয়। তার ভাষায়, দ্রুত প্রত্যাবাসন মানবপাচারকারীদের জন্য একটি শক্ত বার্তা।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশ প্রশ্ন তুলেছে—ফেরত পাঠানো অভিবাসীদের আশ্রয়ের জন্য আবেদন করার অধিকার সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না এবং তারা আইনগত সহায়তা পেয়েছিলেন কি না। অতীতেও মাল্টার বিরুদ্ধে উদ্ধার কার্যক্রমে গাফিলতি এবং অভিবাসীদের লিবিয়ার কোস্ট গার্ডের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যদিও এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে দেশটি।
আশ্রয় সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাল্টায় অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করা অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের একটি বড় অংশকে দ্রুত স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।