দেয়াল, গাছ, খুঁটি বা রাস্তার মোড়ে পোস্টারে ভরা নির্বাচনী পরিবেশ এবার আর থাকছে না। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচনী আচরণবিধিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে এবারই প্রথমবারের মতো পোস্টারবিহীন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
নির্বাচনী আচরণবিধির সংশোধনী অনুযায়ী, ভোটের প্রচারণায় কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না রাজনৈতিক দল কিংবা প্রার্থীরা। একই সঙ্গে লিফলেট, ব্যানার বা ফেস্টুনে দলীয় প্রধান ও প্রার্থী ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
কেন পোস্টার নিষিদ্ধ
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পোস্টারের কারণে পরিবেশ দূষণ, জলাবদ্ধতা ও কৃষিজমির ক্ষতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির প্রেক্ষিতেই পোস্টার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে। পোস্টার নিয়ে সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার ঘটনাও এই সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।
প্রচারে যানবাহনের ওপর কড়াকড়ি
নতুন আচরণবিধিতে প্রচারণায় যানবাহনের ব্যবহারেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা দল বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, নৌযান বা অন্য যান্ত্রিক বাহন নিয়ে মিছিল, শোডাউন বা জনসভা করতে পারবে না। এমনকি মশাল মিছিলও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় কিংবা ভোটের দিন ভোটকেন্দ্র এলাকায় যানবাহন চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকই হেলিকপ্টার বা আকাশযান ব্যবহার করতে পারবেন। অন্য কেউ তা ব্যবহার করলে আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নতুন নিয়ম
এবার প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য নির্দিষ্ট বিধি যুক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রার্থীদের নিজ নিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি, পেজ ও ই-মেইল ঠিকানা আগেই রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি, ভুয়া তথ্য প্রচার, ঘৃণামূলক বক্তব্য, চরিত্রহনন বা বিদ্বেষ ছড়ানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নারী, সংখ্যালঘু বা প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উস্কানিমূলক ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
আইন প্রয়োগে কঠোর ইসি
তফসিল ঘোষণার পর আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ইতোমধ্যে জরিমানাও করেছে নির্বাচন কমিশন। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, আচরণবিধি ভাঙলে আর্থিক জরিমানা থেকে শুরু করে প্রার্থিতা বাতিল পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তিনি বলেন, “আইনের প্রয়োগে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। যেই বিধি ভাঙবে, তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
টিভি সংলাপ ও ডিজিটাল প্রচারণা
এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে একটি টেলিভিশন সংলাপ আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে প্রার্থীরা সরাসরি নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন। পাশাপাশি ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেই প্রচারণার বড় মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পোস্টারবিহীন, শোডাউনমুক্ত এবং ডিজিটাল নির্ভর এই নির্বাচন ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা