- প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে একের পর এক হামলার ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেছেন, এসব হামলার সময় সরকারের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ ও রহস্যজনকভাবে নীরব।

শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ সংবাদমাধ্যম, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে নাগরিক সমাজের ব্যানারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী সারা হোসেন, সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমদ, গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতার, আইনজীবী মানজুর আল মতিনসহ বিভিন্ন নাগরিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, একটি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ–অভ্যুত্থানের পর এমন ভয়াবহ হামলার ধারাবাহিকতা জনগণের কল্পনারও বাইরে ছিল। তাঁর ভাষায়, সংবাদমাধ্যমের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কোনো কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বর্তমানে দৃশ্যমান নয়। কে কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা-ও অস্পষ্ট।
তিনি বলেন, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীর ওপর হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠানের নাম ঘিরে উসকানিমূলক বক্তব্য ও হুমকি ছিল, যা গোয়েন্দা সংস্থার নজরের বাইরে থাকার কথা নয়। তবু কেন আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি তুলে ধরে আনু মুহাম্মদ বলেন, এতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র কি সন্ত্রাসী তৎপরতার পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হচ্ছে—এমন প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেন।
তিনি বলেন, অন্যায় ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বললেই এখন অনেককে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীরের ওপর হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যিনি আশির দশক থেকেই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত, তাঁকে রাজনৈতিক অপবাদ দিয়ে হামলা চালানো উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ বলেন, ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযুক্তদের বিষয়ে নানা তথ্য প্রকাশ পেলেও হত্যাকারীরা কীভাবে দেশ ছাড়ল, সে বিষয়ে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। অতীতের ত্বকী, সাগর–রুনি কিংবা তনু হত্যাকাণ্ডের মতো মামলার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি তিন স্তরে ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান—সংবাদমাধ্যমের পারস্পরিক সংহতি, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত আন্দোলন।
সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ওসমান হাদি হত্যার স্বচ্ছ তদন্ত ও বিচার, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানটসহ বিভিন্ন স্থানে হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার, নির্বাচন সামনে রেখে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ এবং দেশি–বিদেশি উসকানিদাতাদের আইনের আওতায় আনা।
আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, মতভিন্নতা থাকলেও কোনো সংবাদপত্র বা প্রতিষ্ঠানে হামলা কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে আবার সেই মানসিকতায় ফিরে যাওয়া ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তাসলিমা আখতার বলেন, সাম্প্রতিক সহিংসতা গণতান্ত্রিক পরিবেশ নষ্ট করে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনার অংশ বলেই মনে হচ্ছে। অন্যদিকে, সারা হোসেন জানান, চাপের মুখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিদাতাদের অন্তত একটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়েছে এবং কিছু ঘটনায় গ্রেপ্তারও হয়েছে—যা প্রতিরোধের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।