শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মানুষের ঢল: রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার শ্রদ্ধা নিবেদন
ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকা। রাতের শিশিরে ভেজা পিচঢালা সড়ক, হালকা কুয়াশা আর পূর্ব আকাশে সূর্য ওঠার আভাস—সব মিলিয়ে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মহান বিজয় দিবসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ দল বেঁধে, আবার কেউ একা ফুল হাতে স্মৃতিসৌধের পথে অপেক্ষা করতে থাকেন।
রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। এরপর কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। এ সময় বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদান করে এবং বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে।
রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা নিবেদনের কিছুক্ষণ পর জাতীয় স্মৃতিসৌধে উপস্থিত হন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনিও স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে রাখা দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
এ সময় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্য, বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্য, আহত ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, বিদেশি কূটনীতিক, ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা, ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এবং ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে পর্যায়ক্রমে বীর মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বিদেশি কূটনীতিকেরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে স্মৃতিসৌধ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে স্মৃতিসৌধ–সংলগ্ন ঢাকা–আরিচা মহাসড়কের পাশে অপেক্ষমাণ মানুষের ঢল নামে। ফুল, জাতীয় পতাকা আর বিজয়ের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের শ্রদ্ধা নিবেদনে স্মৃতিসৌধের বেদি ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আবদুল মঈন খান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমানসহ দলের নেতারাও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন সাধারণ মানুষ।
শিশু-কিশোরদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। কারও হাতে ছোট ছোট জাতীয় পতাকা, কারও গালে-কপালে আঁকা লাল-সবুজ। পরিবারের সঙ্গে আসা অনেক শিশু স্মৃতিসৌধ ঘুরে দেখে শহীদদের আত্মত্যাগের গল্প শোনে। অনেকেই বলেন, বিজয় দিবস নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন।
এদিকে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সশস্ত্র বাহিনীর আয়োজনে বিশেষ কুচকাওয়াজ ও প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ফ্লাই পাস্ট, প্যারাজাম্প ও বিশেষ অ্যারোবেটিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বিত ব্যান্ড পরিবেশন দর্শকদের আকর্ষণ করে।
বিজয়ের ৫৪তম বছর পূর্তি উপলক্ষে ৫৪ জন প্যারাট্রুপার জাতীয় পতাকা হাতে আকাশ থেকে ভূমিতে অবতরণ করেন, যা বিজয় দিবসের আয়োজনে নতুন মাত্রা যোগ করে। ঢাকার বাইরেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সীমিত আকারে বিমানবাহিনীর ফ্লাই পাস্ট ও ব্যান্ড শো অনুষ্ঠিত হয়।
আজ ১৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়। কোটি মানুষের আত্মত্যাগে অর্জিত এই স্বাধীনতা বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক। বিজয় দিবসে জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করছে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার নতুন অঙ্গীকার ব্যক্ত করছে।